ঢাকা ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গরিবের বিচার, ধনীর বিচার এক করতে হবে —এটাই তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশ আইএইচএফ নেশনস ট্রফিতে ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ বাংলাদেশ কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্বিগুণ যাত্রী সামলাতে হিমশিম দেশের বিমানবন্দরগুলো মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল দলিল পেশ করলো তুরস্ক সাইবার আইনে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকিতে ফাঁসের ঘটনায় বিএআরসির সহকারী পরিচালক আটক: যুব উন্নয়নের ৪৫তম বিসিএসে গেজেট থেকে বাদ: অনিশ্চিত জীবনে ৫৬ মেধাবী সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে দেশ গড়তে চাই রাজধানীতে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও আধুনিক ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করলেন

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে টানাপোড়েন: কমেছে কর্মী গমন

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের প্রধান গন্তব্য। কিন্তু বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন দেশের কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে এই শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কমে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি বিদেশে যান। চলতি বছরের ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন। দু’দিন আগেও দেশে আসার টিকিটের দাম ছিল ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়াল। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০ রিয়ালে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাড়তি ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল খরচ করে দেশে ফিরতে হচ্ছে। গত ১৪ই অক্টোবর রিয়াদ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কাটেন তিনি। রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা: চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। রিয়াদ থেকে বাসে মক্কা, সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় পৌঁছান। আগস্টে এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।

সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দেশটিতে অস্থিরতা ও বিমান চলাচল সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার ফলে প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াত চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ছুটিতে দেশে আসা অন্তত ২০ হাজার কর্মী এখন আটকা পড়েছেন, যাদের অনেকেরই কর্মস্থলে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জনের। চলতি বছরের একই সময়ে তা ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে নেমে এসেছে। রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকায় প্রবাসীদের বিকল্প পথে জেদ্দা দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে, এতে টিকিটের বাড়তি দাম ও দীর্ঘ ভ্রমণের বাড়তি খরচ বহন করতে গিয়ে তারা দিশেহারা। এছাড়া, সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসীরাও প্রতিনিয়ত মিসাইল আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তাদের অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই সৌদি আরবে। সম্প্রতি হুতিদের হামলায় সৌদি আরবে শ্রমবাজারে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষরা। যারা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাদের প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় আসা প্রবাসী সুবল দাস বলেন, দীর্ঘ ১৫ মাস পর দেশে ফেরা। রিয়াদে থাকা আরেক প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রতি মুহূর্ত মিসাইল আতঙ্ক নিয়ে কাজে যাই। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন করে টিকিট কাটতে হয় তাকে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারও এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। চিরচেনা পরিবেশে ফিরে স্বস্তি মিললেও মন জুড়ে জমে আছে আক্ষেপ।

গত জুলাই মাসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় ৫৭ জন বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দেওয়ার পর দেশটি ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে।

সাধারণ কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও হাই-প্রফেশনাল ভিসা চালু রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও ভিসা জটিলতায় অনেকেরই বৈধতা ঝুঁকিতে পড়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় যুদ্ধের ভিডিও অনলাইনে প্রচারের দায়ে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে অনেকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের সঙ্গে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের বৈঠকে শ্রমবাজারের বর্তমান বাধা দূর করা, ট্যাক্সি ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গুটিকয়েক দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঠানো ১ কোটি ১০ লাখ কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশই গিয়েছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় বাজারগুলোতে বিভিন্ন সময় নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় নতুন বিকল্প খোঁজার পথ আরও সংকীর্ণ হয়েছে। এছাড়া, বিকল্প হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতে গিয়েও কর্মীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন; যেমন কম্বোডিয়ায় অনলাইন কলসেন্টারে কাজ দেওয়ার প্রলোভনে অনেককে প্রতারিত করা হয়েছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে; ৯৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল ১০টি দেশ।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। মালয়েশিয়ায় ফের কর্মী নিয়োগ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যেখানে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি জাপানের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আশা করা হচ্ছে, যার মেয়াদ পাঁচ বছর। যদিও এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করছে দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার ওপর। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, শুধু নতুন বাজারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষ করে তোলা, ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় সক্রিয় অভিবাসন কূটনীতি একান্ত প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার নির্ভরতা, দক্ষ কর্মী তৈরিতে সীমাবদ্ধতা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি সংকট আরও বাড়াচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর অভিবাসন কূটনীতিতে জোর না দিলে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। পাশাপাশি এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ।

আপলোডকারীর তথ্য

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে টানাপোড়েন: কমেছে কর্মী গমন

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে টানাপোড়েন: কমেছে কর্মী গমন

আপডেট সময় ০২:৫৫:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের প্রধান গন্তব্য। কিন্তু বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন দেশের কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে এই শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কমে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি বিদেশে যান। চলতি বছরের ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন। দু’দিন আগেও দেশে আসার টিকিটের দাম ছিল ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়াল। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০ রিয়ালে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাড়তি ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল খরচ করে দেশে ফিরতে হচ্ছে। গত ১৪ই অক্টোবর রিয়াদ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কাটেন তিনি। রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা: চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। রিয়াদ থেকে বাসে মক্কা, সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় পৌঁছান। আগস্টে এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।

সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দেশটিতে অস্থিরতা ও বিমান চলাচল সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার ফলে প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াত চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ছুটিতে দেশে আসা অন্তত ২০ হাজার কর্মী এখন আটকা পড়েছেন, যাদের অনেকেরই কর্মস্থলে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জনের। চলতি বছরের একই সময়ে তা ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে নেমে এসেছে। রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকায় প্রবাসীদের বিকল্প পথে জেদ্দা দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে, এতে টিকিটের বাড়তি দাম ও দীর্ঘ ভ্রমণের বাড়তি খরচ বহন করতে গিয়ে তারা দিশেহারা। এছাড়া, সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসীরাও প্রতিনিয়ত মিসাইল আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তাদের অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই সৌদি আরবে। সম্প্রতি হুতিদের হামলায় সৌদি আরবে শ্রমবাজারে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষরা। যারা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাদের প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় আসা প্রবাসী সুবল দাস বলেন, দীর্ঘ ১৫ মাস পর দেশে ফেরা। রিয়াদে থাকা আরেক প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রতি মুহূর্ত মিসাইল আতঙ্ক নিয়ে কাজে যাই। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন করে টিকিট কাটতে হয় তাকে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারও এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। চিরচেনা পরিবেশে ফিরে স্বস্তি মিললেও মন জুড়ে জমে আছে আক্ষেপ।

গত জুলাই মাসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় ৫৭ জন বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দেওয়ার পর দেশটি ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে।

সাধারণ কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও হাই-প্রফেশনাল ভিসা চালু রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও ভিসা জটিলতায় অনেকেরই বৈধতা ঝুঁকিতে পড়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় যুদ্ধের ভিডিও অনলাইনে প্রচারের দায়ে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে অনেকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের সঙ্গে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের বৈঠকে শ্রমবাজারের বর্তমান বাধা দূর করা, ট্যাক্সি ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গুটিকয়েক দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঠানো ১ কোটি ১০ লাখ কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশই গিয়েছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় বাজারগুলোতে বিভিন্ন সময় নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় নতুন বিকল্প খোঁজার পথ আরও সংকীর্ণ হয়েছে। এছাড়া, বিকল্প হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতে গিয়েও কর্মীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন; যেমন কম্বোডিয়ায় অনলাইন কলসেন্টারে কাজ দেওয়ার প্রলোভনে অনেককে প্রতারিত করা হয়েছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে; ৯৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল ১০টি দেশ।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। মালয়েশিয়ায় ফের কর্মী নিয়োগ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যেখানে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি জাপানের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আশা করা হচ্ছে, যার মেয়াদ পাঁচ বছর। যদিও এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করছে দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার ওপর। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, শুধু নতুন বাজারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষ করে তোলা, ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় সক্রিয় অভিবাসন কূটনীতি একান্ত প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার নির্ভরতা, দক্ষ কর্মী তৈরিতে সীমাবদ্ধতা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি সংকট আরও বাড়াচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর অভিবাসন কূটনীতিতে জোর না দিলে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। পাশাপাশি এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ।