ইসরায়েলের আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন একজন ব্যক্তি এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী চরিত্রে পরিণত হয়েছেন, যার নাম ব্যালট পেপারে নেই এবং যিনি নিজেই বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মে মাসে কৌতুকের সুরে বলেছিলেন, তিনি চাইলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদেও নির্বাচন করতে পারেন এবং সেখানে তার জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ। যদিও বাস্তবে জনমত জরিপ এমন বিপুল সমর্থন নির্দেশ করে না, তবুও তার এই রসিকতা গভীর এক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব মানচিত্রে এমন একটি দেশ রয়েছে, যেখানে ভোটযুদ্ধে দাঁড়ালে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব অনায়সেই যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে জিততে পারেন, এবং তিনি নিজেও বিষয়টি খুব ভালো করেই জানেন। যদিও কোনো জনমত জরিপেই এ ধরনের ৯৯ শতাংশ সমর্থনের অঙ্ক মেলেনি। তবে নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে এসে দেখা যাচ্ছে, এই পুরো নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হলেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প—যদিও ব্যালট পেপারে তাঁর কোনো নাম নেই। আর সেটা ৯৯ শতাংশ না হলেও, মোটেও কম নয়। গত জুনে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে প্রতিপক্ষের ওপর ভিত্তি করে তিনি “সম্ভবত” নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করবেন। গত মঙ্গলবার ‘মেরিন ওয়ান’ হেলিকপ্টারে ওঠার আগে ট্রাম্প কেবল রহস্যময়ভাবে এটুকুই বলেন: “আমরা হয়তো কাউকে সমর্থন দিতে পারি। ইসরায়েলি জনগণও বিষয়টি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নীতিগত বিষয়ে অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিন্তু ইসরায়েলে এক চুলও কমেনি। ইসরায়েলিরা তাঁর নীতিকে সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি ট্রাম্পকে তারা ঠিকই ভালোবাসে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত এক দশক ধরে ট্রাম্পের সাথে গভীর সখ্য বজায় রেখে নিজের রাজনীতিকে সুসংহত করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেই উষ্ণ আলিঙ্গন এখন আর আগের মতো নেই। ট্রাম্প ও ইসরায়েলের সম্পর্কের সোনালী সময় ছিল গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে, যখন ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর তার মধ্যস্থতায় হামাসের বন্দি দশা থেকে শেষ ২০ জন ইসরায়েলি মুক্তি পান এবং একই দিনে ট্রাম্প ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেন। সে সময় ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার ঘোষণাও এসেছিল। ট্রাম্প ও ইসরায়েলি রাজনীতির মধ্যকার এই মধুচন্দ্রিমার সম্পর্ক গত বছরের এই সময়ে এক চরম শিখরে পৌঁছেছিল। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ট্রাম্পের সেই ভাষণ এবং জিম্মিদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দৃশ্য একইসঙ্গে সম্প্রচার করেছিল। এর পরপরই শুরু হয় ট্রাম্পকে সম্মান জানানোর পালা। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ ইসরায়েলি ট্রাম্পের ওপর গভীর আস্থা রাখেন। আবার হামাসের হাত থেকে ইসরায়েলি বন্দি মুক্তিতেও ভূমিকা রেখেছেন। ইসরায়েল যেখানে সামরিক অভিযান চালিয়েও সফল হয়নি, হামাসের থেকে সেই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে ট্রাম্পের কূটনীতিক চাপ। সমীকরণটা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: বিবি (নেতানিয়াহু) ট্রাম্পের জৌলুস ধার করে নিজের রাজনীতি চালাতেন, আর ট্রাম্প সেই প্রশংসা ও শ্রদ্ধা উপভোগ করতেন।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ট্রাম্পের সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা ইসরায়েলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দেয়। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি এবং জুলাইয়ে হামাসের সঙ্গে অস্ত্রসংবরণ চুক্তি কার্যকর করার মাধ্যমে ট্রাম্প ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলিদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি আস্থা ও জনপ্রিয়তা বেশ উচ্চ পর্যায়ের ছিল, যা তেল আবিব ইউনিভার্সিটির গবেষকদের কাছে ট্রাম্প ইফেক্ট হিসেবে পরিচিতি পায়। ফলে সাধারণ ইসরায়েলিদের কাছে এই দুটি দৃশ্য যেন এক ও অভিন্ন হয়ে ফুটে উঠেছিল। এরপর আসে ২০২৬ সাল: ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি এবং জুলাই মাসে ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত হামাসের অস্ত্রসংবরণ চুক্তি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘জ্যুইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ৭৩ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সাধারণ প্রেসিডেন্টের চেয়ে বহুগুণ ভালো বলে মনে করেন।
তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারণার উত্তাপে ট্রাম্প এখন অনেকটাই নির্লিপ্ত।
জুন মাসে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নেতানিয়াহুকে সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট করেননি এবং বিরোধী প্রার্থী গাদি আইজেনকোটের ব্যাপারেও কোনো নেতিবাচক কথা বলেননি। এমনকি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সমর্থনের প্রশ্নটি তিনি অন্তত তিনবার কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।
গত মঙ্গলবার হেলিপ্যাডে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলেও নির্দিষ্ট কারো নাম মুখে আনেননি।
ট্রাম্পের এমন রহস্যময় নীরবতা নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের বিরোধী শিবির ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে তাকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচনী জরিপের ফলাফল এখন অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। গড়ে গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার দল ২২.২টি আসন এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১.২টি আসন পাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। জোটগত হিসাব করলে দেখা যায়, ডানপন্থী জোট ৫৪.৪ এবং বিরোধী জায়নবাদী জোট ৫১টি আসন পেতে পারে, যা সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ৬১ থেকে বেশ দূরে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কিন্তু কোনো পক্ষই এককভাবে ছুঁতে পারছে না।
দুই নেতার মধ্যকার এই দূরত্বের পেছনে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও কাজ করছে। ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং লেবানন ও সিরিয়া থেকে সরে আসার চাপে ইসরায়েলকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল। এমনকি ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে পাগল বলে আখ্যা দেওয়ার খবরও প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মহলে নেতানিয়াহুকে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবেই উল্লেখ করেছেন বলে জানায় মার্কিন গণমাধ্যম।
ইসরায়েলি জনগণের মধ্যেও ট্রাম্পের প্রতি বিশ্বাসে ভাটা পড়েছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্প ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন এমন বিশ্বাস মে মাসের ৪৪ শতাংশ থেকে কমে জুন মাসে ২৮ শতাংশে নেমেছে। বিশেষ করে ইহুদি উত্তরদাতাদের মধ্যে ট্রাম্পের ওপর নির্ভরশীলতার হার মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৩৮ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।
এতকিছুর পরও ইসরায়েল সমাজে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় খুব একটা ভাটা পড়েনি। নেতানিয়াহু সম্প্রতি তার দলের প্রার্থী তালিকায় এমন একজনকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যিনি আগে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু বিতর্কের মুখে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলি রাজনীতিতে ট্রাম্পের সমালোচনা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে ইসরায়েল যেন ট্রাম্পের প্রভাব ও অবিশ্বাসের এক অদ্ভুত চক্রে আটকা পড়েছে, যেখানে তার নাম উচ্চারণ করাটাই নির্বাচনী প্রচারণার বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























