ঢাকা ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মক্কা-মদিনায় হুমকি এলে বাংলাদেশ চুপ থাকবে না: শামা ওবায়েদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে ‘কিংমেকার’ মনসুর আব্বাস

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে। কট্টরপন্থী ও ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে নেতানিয়াহু বলছেন, তিনি ক্ষমতা হারালে মনসুর আব্বাসের মতো ইসলামিক দলের নেতারা পরবর্তী সরকারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। তবে বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার পরিস্থিতির সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের নিজ দেশের আরব নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। মনসুর আব্বাস বলেন, তিনি যে পথে আছেন, সে পথের জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। অন্যান্য আরব দলগুলোর নেতারা, তাঁরা মনসুর আব্বাসকে যেন ‘বেইমান’ বলতে বাকি রেখেছেন। কিছু আরব নাগরিকের কাছে মনসুর আব্বাস ইতিমধ্যেই খুব চড়া মূল্য দিচ্ছেন।

কিংমেকার আব্বাস ও রাম দলের রাজনৈতিক ভূমিকা

৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারেন, যা তাঁকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল। এটি ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করেছে। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিন নিজের পেশা বন্ধ রেখেছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী ও কট্টরপন্থী সরকারের পতন ঘটাতে চান। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সম্প্রতি তুবা-জাঙ্গারিয়া এলাকায় গোধূলিলগ্নে শত শত মুসলিম পুরুষ সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে মনসুর আব্বাস জানান, তাঁর এসব প্রচেষ্টার কারণেও তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মনসুর আব্বাস হাসিমুখে সবার সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন, কুশল বিনিময় করছিলেন। উদ্দেশ্য ওই এলাকায় সহিংসতার হার কমানো।

নেতানিয়াহুর পতন ও ঐতিহাসিক জোট সরকার

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে মনসুর আব্বাসের দল ‘রাম’-এর যোগ দেওয়া ছিল যুগান্তকারী এক ঘটনা। এর আগে সাধারণত রাম–এর মতো ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সরকারের বাইরে থেকে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করত ও প্রতিবাদ জানাত। তবে আব্বাস সেই প্রথা ভেঙে বেনেট ও ইয়ার লাপিদের ‘টুগেদার’ জোটে যুক্ত হন। এর ফলে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু। যদিও পরের বছরই (২০২২ সালে) নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার কট্টর ইহুদিবাদী অংশীদারদের নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন এবং সরকার গঠন করেন। এমনকি সেই সরকারের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থাকলেও আপত্তি নেই তাঁর।

তবে মনসুর আব্বাসের যুক্তি হলো, আরবদের জন্য বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতার ব্যবহার করা। এটি করতে গিয়ে যদি আরব নাগরিকদের অপছন্দনীয় কিছু নীতির মুখোমুখি হতে হয়, তবুও মূলধারার নীতি নির্ধারণে যুক্ত থাকা জরুরি।

নিরাপত্তা সংকট ও অক্টোবরের আক্রমণ-পরবর্তী পরিস্থিতি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে অনেক ইসরায়েলি ইহুদিই দেশের আরব নাগরিকদের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আব্বাস ইহুদি সমাজের কাছে পৌঁছানো এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান, যা আরব নেতাদের মধ্যে বিরল ঘটনা ছিল। কারণ, প্রকাশ্যে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই তাঁর দ্বারস্থ হতো।

তা সত্ত্বেও ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, আব্বাস ততই ডানপন্থীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে ‘সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল’ বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি জায়নবাদী বিরোধী নেতারা, যারা একসময় আব্বাসের এই সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন, তারাও এখন কট্টরপন্থী ভোটারদের মন জয় করার প্রতিযোগিতায় আব্বাসের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। নেসেটের ফ্লোরে দুজনে একবার একসঙ্গে নির্বাচন লড়ার বিষয়ে কৌতুক করেছিলেন।

সংগঠিত অপরাধ দমন ও নতুন জোটের প্রয়াস

ইসরায়েলের আরব সমাজে বৃদ্ধি পাওয়া সংগঠিত অপরাধ ও সহিংসতা রোধে আব্বাস সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও বিরোধী আইনপ্রণেতা ইয়োআভ সেগালোভিচের সঙ্গে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেগালোভিচের তত্ত্বাবধানে আব্বাসের সহায়তায় আরব অধ্যুষিত অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে সেগালোভিচের নেওয়া সেই উদ্যোগগুলো বাতিল করা হয়। সরকারি নিষ্ক্রিয়তায় গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক অপরাধ চক্রের সহিংসতায় নিহত হন, যা অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্যে উঠে এসেছে। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থী আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার ২ নম্বর পজিশনের প্রার্থী হবেন। ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস’-এর সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, ‘আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে আব্বাসের এই নীতিগত সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।’। কিন্তু মনসুর আব্বাস সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এটিই সঠিক কাজ ছিল।’। উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সেগালোভিচ আরব সম্প্রদায়গুলোতে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে তাঁর মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিচ বলেন, ‘আমি মনসুরকে বিশ্বাস করি।’ সম্প্রতি নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে আব্বাস একটি বড় ঘোষণা দেন—তিনি ও সেগালোভিচ অপরাধ দমনে যৌথভাবে কাজ করবেন। পাশে সেগালোভিচকে নিয়ে হিব্রু ভাষায় আব্বাস বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য পক্ষকেও বুঝতে হবে।’ এটি মূলধারার আরব ও জায়নবাদী ইহুদি নেতাদের মধ্যে সহযোগিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত।

ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক উত্থান

গ্যালিলির দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত মাঘার শহরে এক মুদিদোকানির ঘরে জন্ম নেন মনসুর আব্বাস। পেশাগত জীবনে তিনি একজন দন্ত চিকিৎসক (ডেনটিস্ট) হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। নিজ শহরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয় দেখে তিনি রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করেন। তিন সন্তানের বাবা আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে প্রথম নির্বাচিত হন।

রাজনীতিতে আসার পর থেকে আব্বাস ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করে আসছেন। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি পোড়ানো সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) পরিদর্শনে যান এবং তা পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেন। সেই ঘটনা স্মরণ করে প্রভাবশালী আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি জানান, “সে সময়ে এটি একদমই অগ্রহণযোগ্য ছিল। ইসলামিক মুভমেন্টের অন্যতম বড় এক নেতা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনি বলে দিতে পারেন মনসুর আব্বাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।’”

ভোটের মাঠে আব্বাসের অবস্থান ও আরব সমাজের প্রতিক্রিয়া

মনসুর আব্বাসের এই নমনীয় ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে সাধারণ আরব নাগরিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তুবা-জাঙ্গারিয়ায় আব্বাসের এক পথসভায় ৫৩ বছর বয়সী ভোটার ইহসান বশির আব্বাসকে আগামী সরকারেও যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। বশির বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে আছে। ওদের সুরক্ষার জন্য এবং আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের সরকারের টেবিলে থাকা দরকার।’

অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনায় আব্বাস আরও সোচ্চার ভূমিকা না নেওয়ায় অনেক আরব নাগরিক তাঁর সমালোচনা করেছেন। গত আগস্ট মাসে দলীয় সম্মেলনে আব্বাস যখন সংক্ষেপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন, তখন ডানপন্থী ইহুদি নেতাদের আশঙ্কায় কট্টর ইসরায়েলি রাজনীতিকরা আব্বাসকে রাষ্ট্র গঠনের চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে প্রচার শুরু করেন। তবে সমস্ত সমালোচনা ও জীবননাশের হুমকি সত্ত্বেও আব্বাস বিশ্বাস করেন—ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরবদের অধিকার ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে হলে মূলধারার ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। দেখেছেন, হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে।

আপলোডকারীর তথ্য

রাজধানীর শান্তিনগরে পুলিশ বক্সের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ

ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে ‘কিংমেকার’ মনসুর আব্বাস

আপডেট সময় ০৮:০৫:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে। কট্টরপন্থী ও ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে নেতানিয়াহু বলছেন, তিনি ক্ষমতা হারালে মনসুর আব্বাসের মতো ইসলামিক দলের নেতারা পরবর্তী সরকারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। তবে বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার পরিস্থিতির সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের নিজ দেশের আরব নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। মনসুর আব্বাস বলেন, তিনি যে পথে আছেন, সে পথের জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। অন্যান্য আরব দলগুলোর নেতারা, তাঁরা মনসুর আব্বাসকে যেন ‘বেইমান’ বলতে বাকি রেখেছেন। কিছু আরব নাগরিকের কাছে মনসুর আব্বাস ইতিমধ্যেই খুব চড়া মূল্য দিচ্ছেন।

কিংমেকার আব্বাস ও রাম দলের রাজনৈতিক ভূমিকা

৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারেন, যা তাঁকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল। এটি ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করেছে। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিন নিজের পেশা বন্ধ রেখেছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী ও কট্টরপন্থী সরকারের পতন ঘটাতে চান। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সম্প্রতি তুবা-জাঙ্গারিয়া এলাকায় গোধূলিলগ্নে শত শত মুসলিম পুরুষ সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে মনসুর আব্বাস জানান, তাঁর এসব প্রচেষ্টার কারণেও তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মনসুর আব্বাস হাসিমুখে সবার সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন, কুশল বিনিময় করছিলেন। উদ্দেশ্য ওই এলাকায় সহিংসতার হার কমানো।

নেতানিয়াহুর পতন ও ঐতিহাসিক জোট সরকার

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে মনসুর আব্বাসের দল ‘রাম’-এর যোগ দেওয়া ছিল যুগান্তকারী এক ঘটনা। এর আগে সাধারণত রাম–এর মতো ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সরকারের বাইরে থেকে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করত ও প্রতিবাদ জানাত। তবে আব্বাস সেই প্রথা ভেঙে বেনেট ও ইয়ার লাপিদের ‘টুগেদার’ জোটে যুক্ত হন। এর ফলে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু। যদিও পরের বছরই (২০২২ সালে) নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার কট্টর ইহুদিবাদী অংশীদারদের নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন এবং সরকার গঠন করেন। এমনকি সেই সরকারের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থাকলেও আপত্তি নেই তাঁর।

তবে মনসুর আব্বাসের যুক্তি হলো, আরবদের জন্য বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতার ব্যবহার করা। এটি করতে গিয়ে যদি আরব নাগরিকদের অপছন্দনীয় কিছু নীতির মুখোমুখি হতে হয়, তবুও মূলধারার নীতি নির্ধারণে যুক্ত থাকা জরুরি।

নিরাপত্তা সংকট ও অক্টোবরের আক্রমণ-পরবর্তী পরিস্থিতি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে অনেক ইসরায়েলি ইহুদিই দেশের আরব নাগরিকদের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আব্বাস ইহুদি সমাজের কাছে পৌঁছানো এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান, যা আরব নেতাদের মধ্যে বিরল ঘটনা ছিল। কারণ, প্রকাশ্যে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই তাঁর দ্বারস্থ হতো।

তা সত্ত্বেও ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, আব্বাস ততই ডানপন্থীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে ‘সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল’ বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি জায়নবাদী বিরোধী নেতারা, যারা একসময় আব্বাসের এই সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন, তারাও এখন কট্টরপন্থী ভোটারদের মন জয় করার প্রতিযোগিতায় আব্বাসের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। নেসেটের ফ্লোরে দুজনে একবার একসঙ্গে নির্বাচন লড়ার বিষয়ে কৌতুক করেছিলেন।

সংগঠিত অপরাধ দমন ও নতুন জোটের প্রয়াস

ইসরায়েলের আরব সমাজে বৃদ্ধি পাওয়া সংগঠিত অপরাধ ও সহিংসতা রোধে আব্বাস সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও বিরোধী আইনপ্রণেতা ইয়োআভ সেগালোভিচের সঙ্গে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেগালোভিচের তত্ত্বাবধানে আব্বাসের সহায়তায় আরব অধ্যুষিত অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে সেগালোভিচের নেওয়া সেই উদ্যোগগুলো বাতিল করা হয়। সরকারি নিষ্ক্রিয়তায় গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক অপরাধ চক্রের সহিংসতায় নিহত হন, যা অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্যে উঠে এসেছে। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থী আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার ২ নম্বর পজিশনের প্রার্থী হবেন। ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস’-এর সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, ‘আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে আব্বাসের এই নীতিগত সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।’। কিন্তু মনসুর আব্বাস সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এটিই সঠিক কাজ ছিল।’। উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সেগালোভিচ আরব সম্প্রদায়গুলোতে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে তাঁর মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিচ বলেন, ‘আমি মনসুরকে বিশ্বাস করি।’ সম্প্রতি নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে আব্বাস একটি বড় ঘোষণা দেন—তিনি ও সেগালোভিচ অপরাধ দমনে যৌথভাবে কাজ করবেন। পাশে সেগালোভিচকে নিয়ে হিব্রু ভাষায় আব্বাস বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য পক্ষকেও বুঝতে হবে।’ এটি মূলধারার আরব ও জায়নবাদী ইহুদি নেতাদের মধ্যে সহযোগিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত।

ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক উত্থান

গ্যালিলির দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত মাঘার শহরে এক মুদিদোকানির ঘরে জন্ম নেন মনসুর আব্বাস। পেশাগত জীবনে তিনি একজন দন্ত চিকিৎসক (ডেনটিস্ট) হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। নিজ শহরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয় দেখে তিনি রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করেন। তিন সন্তানের বাবা আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে প্রথম নির্বাচিত হন।

রাজনীতিতে আসার পর থেকে আব্বাস ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করে আসছেন। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি পোড়ানো সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) পরিদর্শনে যান এবং তা পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেন। সেই ঘটনা স্মরণ করে প্রভাবশালী আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি জানান, “সে সময়ে এটি একদমই অগ্রহণযোগ্য ছিল। ইসলামিক মুভমেন্টের অন্যতম বড় এক নেতা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনি বলে দিতে পারেন মনসুর আব্বাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।’”

ভোটের মাঠে আব্বাসের অবস্থান ও আরব সমাজের প্রতিক্রিয়া

মনসুর আব্বাসের এই নমনীয় ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে সাধারণ আরব নাগরিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তুবা-জাঙ্গারিয়ায় আব্বাসের এক পথসভায় ৫৩ বছর বয়সী ভোটার ইহসান বশির আব্বাসকে আগামী সরকারেও যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। বশির বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে আছে। ওদের সুরক্ষার জন্য এবং আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের সরকারের টেবিলে থাকা দরকার।’

অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনায় আব্বাস আরও সোচ্চার ভূমিকা না নেওয়ায় অনেক আরব নাগরিক তাঁর সমালোচনা করেছেন। গত আগস্ট মাসে দলীয় সম্মেলনে আব্বাস যখন সংক্ষেপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন, তখন ডানপন্থী ইহুদি নেতাদের আশঙ্কায় কট্টর ইসরায়েলি রাজনীতিকরা আব্বাসকে রাষ্ট্র গঠনের চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে প্রচার শুরু করেন। তবে সমস্ত সমালোচনা ও জীবননাশের হুমকি সত্ত্বেও আব্বাস বিশ্বাস করেন—ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরবদের অধিকার ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে হলে মূলধারার ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। দেখেছেন, হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে।