ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে আজ দু-চারটি কথা বলতে চাই। অন্ধ সমর্থন থেকে নয়, ন্যায্যতার স্বার্থে; ব্যক্তিপূজা থেকে নয়, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। ড. ইউনূসের অনেক সমালোচনা আছে। তাঁর সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সংস্কারের গতি, অর্থনৈতিক নীতি কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু সমালোচনা আর হেনস্তা এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা আর ব্যক্তিগত অপমানও এক নয়।
গণঅভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যখন গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও আস্থার ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনার এই দায়িত্ব মোটেও সহজ ছিল না। প্রত্যাশা ছিল বিপুল, সমস্যা ছিল বহুমাত্রিক, আর রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল তীব্র। তিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন কি না, সেই প্রশ্ন থাকবেই। তাঁর সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের হাল ধরা, সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টিও মূল্যায়নে বিবেচনা রাখতে হবে। শুধু ব্যর্থতার তালিকা দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না; অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই দেখতে হয়। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন
শেখ হাসিনার শাসনামলে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা, আইনি লড়াই এবং তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাঁর বিরুদ্ধে শ্রম আইন ব্যবহারের ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, একজন নাগরিক যত পরিচিত বা প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁর অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বিচার পাওয়ার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ অক্টোবর, নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে তাঁকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটিও সেই আলোচনার অংশ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুইলচেয়ারে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় একদল ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে স্লোগান ও কটূক্তি করেন। এমন পরিস্থিতি তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিঘ্নিত করে, যা রাজনৈতিক জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দায়বদ্ধতা
- কোনো চুক্তি জনস্বার্থের পরিপন্থী হলে তার ব্যাখ্যা দাবি করা হোক; তবে রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের চুক্তি বৃহত্তর নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অংশ।
- সব দায় এক ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন যথাযথ নয়, তেমনি সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নেই—এমন ধারণাও গ্রহণযোগ্য নয়।
- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ দিয়েই একটি সমাজের গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একজনের প্রতি অন্যায় আচরণকে সমর্থন করলে ভবিষ্যতে একই আচরণের শিকার অন্য কেউও হতে পারেন।
- ব্যক্তি নয়, নীতি; আবেগ নয়, তথ্য; প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার—এই হওয়া উচিত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
পরিশেষে বলতে চাই, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতিহাসের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকা আছে। সেই ভূমিকার বিচার হবে যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে এবং সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। সমালোচনা করুন, প্রশ্ন তুলুন, জবাবদিহি দাবি করুন—কিন্তু কাউকে অপমান করে নয়। বাংলাদেশের জন্য আমাদের প্রত্যাশা এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে কেউ ক্ষমতার জোরে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবেন না, আবার কেউ রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে অপমান ও হেনস্তার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হবেন না। ন্যায়বিচার ও মর্যাদা সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























