চলতি করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে অনেক করদাতা লক্ষ্য করছেন যে, আগের বছরের তুলনায় তাঁদের করের পরিমাণ বেড়েছে। অথচ এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। মূলত অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে ব্যক্তিশ্রেণির আয়করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা অনেকের ক্ষেত্রে বাড়তি করের বোঝা তৈরি করেছে। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, করধাপের পরিবর্তন, বিনিয়োগ রেয়াত হ্রাস, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার করপদ্ধতি এবং ন্যূনতম করের নতুন নিয়মগুলো এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে, একই আয় ও বিনিয়োগে করের অঙ্ক কীভাবে বদলাতে পারে।
একজন করদাতার করযোগ্য আয় ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে করের হারে তেমন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। কিন্তু করযোগ্য আয় ৭ লাখ টাকা অতিক্রম করলেই করের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। সাধারণ করদাতার জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা। এই সীমার পরের ধাপে এবার ৫ শতাংশের পরিবর্তে সরাসরি ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৪ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় ১০ শতাংশ হারে করযোগ্য। এরপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ৪ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, তার পরের ৫ লাখে ২০ শতাংশ, তার পরের ২০ লাখে ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়টি হলো আয়বর্ষ।
বিনিয়োগ রেয়াত কমানোর ফলে একই পরিমাণ বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেয়াত বা কর ছাড়ের সুবিধা কমে গেছে। আগে মোট আয়ের ৩ শতাংশ, বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটির ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ রেয়াত হিসাব করা হতো। কিন্তু এবার অনুমোদিত বিনিয়োগের হার ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ বিনিয়োগ রেয়াত ১০ লাখ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ লাখ টাকা করযোগ্য আয় এবং ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকা একজন সাধারণ করদাতা আগের নিয়মে যেখানে ৩০ হাজার টাকা রেয়াত পেতেন, সেখানে এবার ২০ হাজার টাকা রেয়াত পাচ্ছেন। এতে তাঁর নিট কর ৩৭ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার টাকা হয়ে গেছে, অর্থাৎ কর বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। এবারও মোট আয়ের ৩ শতাংশের শর্তটি আছে। গতবার তাঁর মূল কর ছিল ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। এবার তাঁর মূল কর হবে ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ একই আয় ও একই বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর কর বাড়বে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার করপদ্ধতি বদলের প্রভাবও করদাতাদের ওপর পড়েছে। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎস কর কেটে রাখলেই দায় মিটে যেত। কিন্তু এখন এটি মোট আয়ের সাথে যুক্ত হবে এবং করদাতার প্রযোজ্য করহার অনুযায়ী কর সমন্বয় করা হবে। ফলে উচ্চ করধাপে থাকা করদাতাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বাড়তি কর দিতে হতে পারে।
সারা দেশে ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় কম আয়ের করদাতাদের ওপর প্রভাব পড়েছে। নতুন করদাতার ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা। গত বছর ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর থাকলেও অন্যান্য সিটি করপোরেশনে এটি ৪ হাজার এবং সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩ হাজার টাকা ছিল। ফলে ঢাকার বাইরের অনেক করদাতার জন্য ন্যূনতম করের অংক ১ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এসব নিয়ম আগের করবর্ষের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অনেক করদাতার কর বেড়েছে।
রিটার্ন দাখিলের সময়ের ওপর নির্ভর করে প্রণোদনা ও বাড়তি করের হিসাবও আলাদা। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ওপর ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ ছিল, যার সর্বোচ্চ সীমা ছিল ২৫ হাজার টাকা। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দিলে বাড়তি কর দিতে না হলেও এই ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ ও এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে যথাক্রমে কমপক্ষে ৩ হাজার ও ৫ হাজার টাকা বাড়তি কর দিতে হবে।
প্রণোদনা হিসাবের ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে। এটি পুরো করের ওপর নয়, বরং উৎসে বা অগ্রিমে কর কর্তনের পর যে কর বাকি ছিল, মূলত তার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। ফলে চাকরিজীবীরা, যাদের কর আগেই কেটে রাখা হয়েছে, তারা অনেক ক্ষেত্রে এই প্রণোদনার সুবিধা পাননি। গতবার তিনটি হিসাবের মধ্যে সবচেয়ে কম অঙ্কটি রেয়াত হিসেবে পাওয়া যেত।
বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ভিন্ন। সাধারণ করদাতার সীমা ৪ লাখ টাকা হলেও নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য তা সাড়ে ৪ লাখ টাকা। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এই সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একজন করদাতা বিনিয়োগের সময় নতুন এই কর নীতিমালা সম্পর্কে অবগত থাকার সুযোগ না পাওয়ায় অর্থ আইন ২০২৬-এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আয়বর্ষের শেষ দিকে আইনটি কার্যকর হওয়ার ফলে করদাতারা সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারেননি, যা অনেকের জন্য কর বৃদ্ধির একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















