ঢাকা ০৩:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ফাগুনের মোহনায় আজ ভালোবাসার সমাপতন

আকাশ জাতীয় ডেস্ক :

প্রকৃতির নিয়ম মেনে শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের অভিষেক ঘটছে আজ। ১৪ ফেব্রুয়ারি। পঞ্জিকার পাতায় এটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির হৃদয়ে দুই পলিমাটির মিলনস্থল। একদিকে হিরণ্ময় ফাল্গুনের প্রথম দিন, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হবে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বাসন্তী রঙের আবির আর হৃদয়ের লাল রং আজ মিলেমিশে একাকার।

২০২৬ সালের এ বসন্তবরণ অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন মেজাজের। কারণ, ঢাকার রাজপথে এবার উৎসব আছে, কিন্তু তার সঙ্গে চিরচেনা ‘অমর একুশে বইমেলা’র সেই ধূলিমাখা সাহচর্য নেই। একই সঙ্গে সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আবহ এখনও রয়েছে দেশজুড়ে। একদিনে দুই উৎসবের সমাপতনের পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও পঞ্জিকা সংস্কারের গল্প।

বাঙালির ফাল্গুন কেবল ফুলের সাজ নয়, এটি আত্মপরিচয় খোঁজার মাস। ১৯৫২ সালের ৮ ফাল্গুন (২১শে ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই ফাল্গুন আমাদের কাছে দ্রোহ আর প্রেমের প্রতীক। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বসন্ত উৎসব’ পালনের সূচনা হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪ সাল) থেকে। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের হাত ধরে ঢাবি চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় প্রথম এ উৎসবের প্রদীপ জ্বলে ওঠে। সেই থেকে আজ অবধি পহেলা ফাল্গুন বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

ভালোবাসা দিবসের প্রেক্ষাপট বহু প্রাচীন। যদিও এটি নিয়ে সত্যতা ও মতভেদ রয়েছে অনেক। তবুও এটি লোকমুখে আজও প্রচলিত। ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের রাজত্বকালে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে এক যাজক ছিলেন। সম্রাট তরুণদের যুদ্ধে পাঠাতে বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গোপনে প্রেমাতুর যুগলদের বিয়ে দিতেন। এ অপরাধে তাঁকে ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর ত্যাগের স্মৃতিতেই দিনটি ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’।

বাংলাদেশে এ দিবসের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারিগর সাংবাদিক শফিক রেহমান। নব্বইয়ের দশকে তিনি তাঁর ‘যায়যায়দিন’-এ দিনটিকে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে বাঙালি হৃদয়ে পৌঁছে দেন। আগে পহেলা ফাল্গুন পালন করা হতো ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাংলা একাডেমি ২০১৯ সালে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের ফলে ২০২০ সাল থেকে ফাল্গুনের প্রথম দিনটি এখন আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে বসন্ত আর ভালোবাসা এখন একই বৃন্তের দুটি ফুল।

শহরে জাঁকজমক থাকলেও বসন্তের প্রকৃত রূপ দেখা যায় গ্রামবাংলায়। সেখানে ক্যালেন্ডার দেখে নয়, আমগাছে মুকুলের ঘ্রাণ আর কুয়াশাভেজা সকালে কোকিলের ডাকে ফাল্গুন আসে। গ্রামীণ তরুণীরা বাড়ির আঙিনায় ফোটা গাদা ফুল দিয়ে ঘর সাজান। অনেক গ্রামে এখনও বসন্ত উপলক্ষে ‘বাসন্তী মেলা’ বসে, যেখানে নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, আর মাটির খেলনার পসরা বসে। প্রবীণরা এদিন দাওয়ায় বসে নতুন চালের পিঠার স্বাদ নেন। ভালোবাসা দিবস সেখানে আলাদা কোনো মোড়ক ছাড়াই ‘মায়া’ ও ‘স্নেহ’ হিসেবে প্রতিটি ঘরে বিরাজ করে।

ঢাকার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকাল হতেই রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। তরুণদের কাছে এটি ‘সেলফিবন্দি’ হওয়ার দিন। হলুদ পাঞ্জাবি, বাসন্তী শাড়ির আধিক্যের মাঝে লাল গোলাপের একচ্ছত্র আধিপত্য। রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাতিরঝিল, পূর্বাচল, দিয়াবাড়ী এলাকায় তিলধারণের জায়গা থাকে না। তরুণরা কেবল উপহার আদান-প্রদান নয়, বরং ক্যাফে আর রেস্তোরাঁগুলোতে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে দিনটি যাপন করে থাকে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

ফাগুনের মোহনায় আজ ভালোবাসার সমাপতন

আপডেট সময় ১০:১৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক :

প্রকৃতির নিয়ম মেনে শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের অভিষেক ঘটছে আজ। ১৪ ফেব্রুয়ারি। পঞ্জিকার পাতায় এটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির হৃদয়ে দুই পলিমাটির মিলনস্থল। একদিকে হিরণ্ময় ফাল্গুনের প্রথম দিন, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হবে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বাসন্তী রঙের আবির আর হৃদয়ের লাল রং আজ মিলেমিশে একাকার।

২০২৬ সালের এ বসন্তবরণ অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন মেজাজের। কারণ, ঢাকার রাজপথে এবার উৎসব আছে, কিন্তু তার সঙ্গে চিরচেনা ‘অমর একুশে বইমেলা’র সেই ধূলিমাখা সাহচর্য নেই। একই সঙ্গে সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আবহ এখনও রয়েছে দেশজুড়ে। একদিনে দুই উৎসবের সমাপতনের পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও পঞ্জিকা সংস্কারের গল্প।

বাঙালির ফাল্গুন কেবল ফুলের সাজ নয়, এটি আত্মপরিচয় খোঁজার মাস। ১৯৫২ সালের ৮ ফাল্গুন (২১শে ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই ফাল্গুন আমাদের কাছে দ্রোহ আর প্রেমের প্রতীক। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বসন্ত উৎসব’ পালনের সূচনা হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪ সাল) থেকে। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের হাত ধরে ঢাবি চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় প্রথম এ উৎসবের প্রদীপ জ্বলে ওঠে। সেই থেকে আজ অবধি পহেলা ফাল্গুন বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

ভালোবাসা দিবসের প্রেক্ষাপট বহু প্রাচীন। যদিও এটি নিয়ে সত্যতা ও মতভেদ রয়েছে অনেক। তবুও এটি লোকমুখে আজও প্রচলিত। ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের রাজত্বকালে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে এক যাজক ছিলেন। সম্রাট তরুণদের যুদ্ধে পাঠাতে বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গোপনে প্রেমাতুর যুগলদের বিয়ে দিতেন। এ অপরাধে তাঁকে ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর ত্যাগের স্মৃতিতেই দিনটি ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’।

বাংলাদেশে এ দিবসের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারিগর সাংবাদিক শফিক রেহমান। নব্বইয়ের দশকে তিনি তাঁর ‘যায়যায়দিন’-এ দিনটিকে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে বাঙালি হৃদয়ে পৌঁছে দেন। আগে পহেলা ফাল্গুন পালন করা হতো ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাংলা একাডেমি ২০১৯ সালে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের ফলে ২০২০ সাল থেকে ফাল্গুনের প্রথম দিনটি এখন আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে বসন্ত আর ভালোবাসা এখন একই বৃন্তের দুটি ফুল।

শহরে জাঁকজমক থাকলেও বসন্তের প্রকৃত রূপ দেখা যায় গ্রামবাংলায়। সেখানে ক্যালেন্ডার দেখে নয়, আমগাছে মুকুলের ঘ্রাণ আর কুয়াশাভেজা সকালে কোকিলের ডাকে ফাল্গুন আসে। গ্রামীণ তরুণীরা বাড়ির আঙিনায় ফোটা গাদা ফুল দিয়ে ঘর সাজান। অনেক গ্রামে এখনও বসন্ত উপলক্ষে ‘বাসন্তী মেলা’ বসে, যেখানে নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, আর মাটির খেলনার পসরা বসে। প্রবীণরা এদিন দাওয়ায় বসে নতুন চালের পিঠার স্বাদ নেন। ভালোবাসা দিবস সেখানে আলাদা কোনো মোড়ক ছাড়াই ‘মায়া’ ও ‘স্নেহ’ হিসেবে প্রতিটি ঘরে বিরাজ করে।

ঢাকার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকাল হতেই রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। তরুণদের কাছে এটি ‘সেলফিবন্দি’ হওয়ার দিন। হলুদ পাঞ্জাবি, বাসন্তী শাড়ির আধিক্যের মাঝে লাল গোলাপের একচ্ছত্র আধিপত্য। রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাতিরঝিল, পূর্বাচল, দিয়াবাড়ী এলাকায় তিলধারণের জায়গা থাকে না। তরুণরা কেবল উপহার আদান-প্রদান নয়, বরং ক্যাফে আর রেস্তোরাঁগুলোতে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে দিনটি যাপন করে থাকে।