অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
কোটা সংস্কারের আন্দোলনের মুখে কোটা যখন বাতিল করার প্রক্রিয়া চলছে সেই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে। এর অংশ হিসেবেই শনিবার রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ডাকা হয়েছে গণজমায়েত। আয়োজকরা বলছেন, শাহবাগের সমাবেশের পর এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন তারা।
সবধরনের কোটা মিলিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে গত ১২ এপ্রিল সংসদে ‘কোনো কোটা থাকার দরকার নেই’ বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে শান্ত হয়েছে পরিস্থিতি।
প্রধানমন্ত্রী অবশ্য সেদিন সিদ্ধান্ত নয়, তার অবস্থান জানিয়েছেন। বলেছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কমিটির প্রতিবেদনের পরই সিদ্ধান্ত হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে, এমনটাও ভাবছে না আন্দোলনকারীরা। ফলে কোটা উঠে যাচ্ছে, ভেবে নিয়েছে সব পক্ষ।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী সেদিন সংসদে কথা বলেছেন কেবল বিসিএস চাকরি নিয়ে। ফলে কোটার বিষয়ে তার অবস্থান কেবল বিসিএস বা প্রথম শ্রেণির চাকরির ওপর প্রযোজ্য হবে, নাকি সব সরকারি চাকরিতেই হবে, সেটি বোঝা যাবে প্রজ্ঞাপনের পর। এই প্রজ্ঞাপনের জন্য যখন অপেক্ষা তখন আবার ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় কর্মসূচি শুরু করেছে মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের স্বজনরা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকেই সব ধরনের সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল। শুরুতে জেলা কোটা ছিল ৪০ শতাংশ। সেটি কমিয়ে ধীরে ধীরে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটা সব নারীর ওপর প্রযোজ্য হয়। চালু হয় পাঁচ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতা বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরকে এবং পরে নাতি নাতনিদেরকে এই সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৭ সালের দিকে প্রধানত জামায়াত-শিবিরের অনুসারীরা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এরপর নানা সময় এই দাবি তুলে তারা ব্যর্থ হয়।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ ব্যাপারে আন্দোলন শুরু হয় কোটা সংস্কারের দাবিতে। তারা মুক্তিযোদ্ধা, নারী, জেলা, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলিয়ে কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। আর আগের মতো মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিষয়টি সরাসরি দাবিতে না তোলার পর সারা দেশেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে দাবির সমর্থন ছড়িয়ে পড়ে।
আর ৮ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। আর এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান জানান।
এর মধ্যে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ নামে সংগঠন আবার পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল, শূন্য পদে বিশেষ নিয়োগ এবং মুক্তিযোদ্ধা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবিতে গণ সমাবেশের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনের সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘কোটা বাতিলের সময় এখনও আসে নাই, এখনও মুক্তিযোদ্ধাদের হাজার হাজার সন্তান চাকরি পাননি, অনেক বেকার রয়েছে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাব, কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুর্নবিবেচনা করবেন।’
সংগঠনের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল না করা হলে ৭১-এর পরাজিত শক্তি ডুগডুগি বাজাবে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান-অপদস্থ করতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার ফলে তারা আজ উল্লাসে মেতে উঠেছে।’
সাজ্জাদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই কোটা পদ্ধতি চালু ছিল, কিন্তু ৭৫ এর পর ৯৬ সাল পর্যন্ত কোটা থাকলেও কোটায় কোন নিয়োগ হয়নি। এমনকি ওই সময়টায় মুক্তিযোদ্ধারা পরিচয় পর্যন্ত দিতে পারে নাই। এখনও হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেকার হয়ে আছে। এখনই কোটা বাতিল করার মতো সময় আসে নাই।’
“আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু কোটা আন্দোলনের নামে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধাদের কটূক্তি করা হয়েছে। আন্দোলনে অনেকে প্লেকার্ড ঝুলিয়েছে ‘আমি রাজাকারের সন্তান’ এগুলোর বিচার হওয়া উচিত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমরা এই রকম আচরণ আশা করি নাই।”
‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ এর পাশাপাশি সম্প্রতি মাঠে নেমেছে ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম সমন্বয় পরিষদ’ নামে আরও একটি সংগঠন। তারা সরকারি চাকরিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তরসূরিদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আইন চাইছে। গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জমায়েতে এই দাবি তুলে ধরে। সেখানে জানানো হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষে এই ধরনের আইন করা হয়েছিল। সেখানে স্বাধীনতাবিরোধীদের তিন প্রজন্মের অধিকার সংকুচিত ছিল।
ওই সমাবেশে তোলা ছয় দফা দাবিতে আগামী ৯ জুন বিকাল তিনটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানদের নিয়ে সমাবেশেরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















