অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে পাল্টে দিয়ে দেশ, সমাজ এবং মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছে মঙ্গল শোভযাত্রায় আসা হাজারো মানুষ।
বাংলা নববর্ষের অন্যতম আয়োজন পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভযাত্রায় প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রতিপাদ্য থাকে। এবারের প্রতিপাদ্যটি নেয়া হয়েছে ফরির লালন সাইয়ের বিখ্যাত গানের কলি ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’
এই সোনার মানুষ কারা? প্রশ্নে ছুড়ে মঙ্গল শোভযাত্রায় আসা এক জনের কাছে জবাব মিলল, ‘মানবসেবার মাধ্যমেই একজন সোনার মানুষ হওয়া যায়। আর একটি ভালো সমাজের আকাঙ্ক্ষাও বাস্তবায়ন করতে পারে এই সোনার মানুষগুলোই।’
অন্য একজন বলেন, ‘আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষের আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজের পরিবর্তন আসবে, নিজের পরিবর্তন হলে সমাজের পরিবর্তন হবে, আর সমাজের পরিবর্তন হলে পুরো দেশের পরিবর্তন হবে।’
পয়লা বৈশাখের আজকের দিনে হাজারো মানুষের ঢলে মঙ্গলের এই যাত্রায় কমতি ছিল না আনন্দ, উল্লাস আর উচ্ছ্বাসের। বাঙালিপনার বিরুদ্ধে নানা নামে হওয়া আক্রমণ, বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী যত অপশক্তি, দেশ, সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে যত অপচেষ্টা সব রুখে দেয়ার প্রত্যয়ও ঝরে পড়েছে অংশগ্রহণকারীরে কণ্ঠে।
রৌদ্রোজ্জ্বল সকালবেলায় বর্ণিল যাত্রায় ছিল না বেদনা বা অপ্রাপ্তির কোনো কালো ছায়া। নেচে–গেয়ে, ডাক-ঢোলের বাদ্য বাজিয়ে বাংলার চিরায়ত সাজে নববর্ষকে বরণ করছে সবাই। সবার প্রত্যাশা, নতুন বছরটি হবে-ভালো, আরও ভালো।
এই আয়োজনে তরুণ থেকে প্রবীণ, এসেছে সব বয়সীরা, এসেছে সব ধর্ম, বর্ণের, শ্রেণির, লিঙ্গের মানুষরা। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও দল বেঁধে অংশ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছে।
নতুন প্রজন্ম তথা শিশুদেরকেও মানুষ নিয়ে এসেছে দল বেঁধে। বাঙালিপনা আর সুনাগরিকের দীক্ষা নিয়েছে তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ফাহমিদুর রহমান দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই, আর সোনার মানুষ গড়তে হলে আত্মশুদ্ধি করতে হবে। বছরের শুরুটা নিজেকে শুদ্ধির মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। নববর্ষের যে আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা ভাবলে চলবে না।’
সোনার মানুষ কারা, তা ব্যাখ্যা করে ফাহমিদুর বলেন, ‘সোনার মানুষ হলো ভালো মানুষ। ভালো মানুষ ভালো কাজ করবে। এ জন্য বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন বার্তা দিয়েছে, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করে ভালো মানুষ হওয়া যায়। এ জন্য আমাদের এখন থেকেই নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। নিজের পরিবর্তন হলেই সমাজের পরিবর্তন হবে।’
পহেলা বৈশাখে ঘুরতে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই মানুষ সোনার মানুষ হতে পারে। আমরা যত আত্মসমালোচনা করব ততই নিজেকে শুদ্ধ করতে পারব। যার মধ্য দিয়ে সমাজের কাঙ্ক্ষিত মানুষ হতে পারব।’
ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সুলতানা ইসলাম বলেন, ‘নববর্ষের শুরু থেকেই আমরা নিজেদের সঠিক পথে পরিচালনার শপথ নেব। যাতে করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অংশীদার হতে পারি। আমাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে, তবেই আমরা দেশের এবং দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর হব।’
সকাল নয়টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অংশ নিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সদস্যরা।
শোভাযাত্রাটি শাহবাগ, রূপসী বাংলা হয়ে আবারও শাহবাগ, টিএসসি হয়ে চারুকলায় গিয়ে সকাল সোয়া ১০টার দিকে শেষ হয়।
এই শোভযাত্রার বিরুদ্ধে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। কিন্তু অংশগ্রহণকারীরা বলছে, এসব অপশক্তি বাঙালিত্বকে, বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং নিজের দেশের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকেও ধর্মের আবরণে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে। একইভাবে দেশের প্রধান উৎসব হয়ে উঠা বর্ষবরণকেও বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে ধর্মের আবরণ দিয়েই। কিন্তু তাদেরকে এসব অপব্যাখ্যা বাঙালি কখনও গ্রহণ করেনি, করবেও না, এটা সারা দেশে কোটি মানুষ রাজপথে নেমে এসে নববর্ষ উদযাপন করেই বুঝিয়ে দিয়েছে।
মঙ্গল শোভযাত্রায় অংশ নেয়া হাজারো মানুষ বলেছেন, মানুষের এই শক্তিই প্রতিরোধ করবে সব অপশক্তি, গড়ে তুলবে সোনার বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীকে কেউ কোনো অপযুক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে না।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















