ঢাকা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানাতে হবে, এটাই আমাদের স্বপ্ন: পার্থ নির্বাচন ব্যবস্থায় কোনো নিরপেক্ষতা দেখছি না: জি এম কাদের সংবিধানের দুর্বলতা দূর করতেই গণভোট: আলী রীয়াজ নির্বাচনে ‘অনিয়ম’ হলেই কেবল জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন: আসিফ নজরুল ওরা দেশকে ভালোবাসার নামে আমেরিকার সঙ্গে গোপন বৈঠক করে: চরমোনাই পীর বিশ্বকাপে বাংলাদেশে বাদকে দিয়ে স্কটল্যান্ডকে নিলো আইসিসি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিতে সংলাপ জরুরি : শিক্ষা উপদেষ্টা আমার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, যা প্রয়োজন তাই করব: মির্জা আব্বাস নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না : সুজন

রংপুরের ভোটারদের অপমান করেছে বিএনপি: স্থানীয় বিশেষজ্ঞ

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি রংপুরের ভোটারদের সঙ্গে ন্যয়সঙ্গত আচরণ করেনি বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার নিয়ে কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি মনে করেন, বিএনপির এই অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না। আর রংপুরে দলটি এবার যে ভোট পেয়েছে, তাতে তাদের খুশি হওয়ার কথা ছিল।

বৃহস্পতিবার উত্তরের জেলা রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের দিকে দৃষ্টি ছিল গোটা দেশেরই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি-তিন দলের প্রার্থীই এই নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশায় লড়াই করছিলেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট ও সমমনাদের বর্জনের পর থেকেই বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ভোটারদের বাধা দেয়ার মতো ঘটনা ফিরে আসায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আগের কমিশন এ বিষয়ে জোরাল পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা আছে।

তবে গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়া কে এম নুরুল হুদা কমিশন ভোটে কারচুপির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সুষ্ঠু ভোট করার কথা বলছে। এই কমিশনের অধীনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর এবার রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলো। কুমিল্লায় কয়েকটি কেন্দ্রে গোলযোগের ঘটনা ঘটলেও রংপুরে সেটা হয়নি। ১৯৩ কেন্দ্রের প্রতিটিতেই ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণ। নাগরিকদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগের কথা উঠে আসেনি গণমাধ্যমে। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে ভোটের পরিস্থিতি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে, সেখানেও কোনো কারচুপির অভিযোগ করেনি কোনো পক্ষ।

তবে ঢাকায় দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ তুলেছেন কারচুপির। তিনি দাবি করেছেন, তাদের এজেন্টদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে।

ভোটের পরদিন শুক্রবার রাজধানীতে এক কর্মসূচিতে রিজভী এমনও দাবি করেন, ভোটের সকালেই ক্ষমতাসীন দল ও জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা কেন্দ্র দখল করে দিনভর সিল মেরেছে। গণমাধ্যম কর্মীদেরকে কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি বলে তারা এসব চিত্র তুলে ধরতে পারেনি বলেও অভিযোগ তার।

বাংলাদেশে ভোটে হারলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার রীতি আছে বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে। এমনও দেখা গেছে, ফলাফল ঘোষণার আগে তা প্রত্যাখ্যান করা দল ভোটে জিতেছে। এরপর অবশ্য তারা সুর পাল্টেছে। নির্বাচন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বরাবর রাজনৈতিক দলের এমন মনোভাবের সমালোচনা করে আসছেন। তারা একে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি বাধা হিসেবেই দেখছেন।

রংপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়াকেও বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। এই দুই বিশেষজ্ঞই নানা সময় নির্বাচনে কারচুপির ঘটনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা সময় নানা পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

রংপুর নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি হয়েছে বলে মনে করেন না এই দুই বিশিষ্ট জন।

তোফায়েল আহমেদ দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘রংপুরের সিটি নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করছে যে, এই নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। এটা তাদের নিজের একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টিকে আমি রাজনীতির অপেশাদারিত্ব হিসেবে দেখছি, বিএনপি এ বিষয়ে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে।’

‘একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এটা আমরা আশা করি না। রংপুর নির্বাচন নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে সেটা কারো ব্যক্তিগত বক্তব্য হয়ে থাকতে পারে।’

রংপুরে বিএনপির অবস্থান বরাবরই দুর্বল। ১৯৯০ সাল থেকে কোনো নির্বাচনেই তারা ভালো করতে পারেনি। বরং বেশিরভাগ নির্বাচনেই তাদের প্রার্থীরা সেখানে জামানত হারিয়েছেন। এবারও বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে না পারলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, ভোটের ফলাফলে বিএনপির খুশি হওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘গত নির্বাচনে (২০১২ সালের মেয়র নির্বাচনে) বিএনপির প্রার্থী এখানে ভোট পেয়েছিল ২১ হাজার, এ নির্বাচনে তারা পেয়েছে ৩৫ হাজার ভোট। রংপুরের মানুষ বিএনপিকে বিমুখ করে নাই, সে মানুষগুলোকে তাদের অবমাননা করা তাদের উচিত হয়নি।’

‘তাদের তো রংপুরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো উচিত ছিল, ভোট দেওয়ার জন্য রংপুরের মানুষকে অভিনন্দন জানানো উচিত ছিল। এই মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারি দলের আঁতাত-ফাতাত সেগুলো বলতে পারত। কিন্তু তা না করে কারচুপির অভিযোগ এনে বক্তব্য দেয়াটা তাদের ঠিক হয়নি।’

‘বিএনপির সংবাদ সম্মেরনে বক্তব্যটি আগে থেকে লেখা ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।’

ভোট নিয়ে বিরোধী দলের ঢালাও অভিযোগ বরাবরই চলে আসছে বাংলাদেশে। ভোটে সরকারি দলের কারচুপির অভিযোগের পাশাপাশি ভালো ভোটের ক্ষেত্রে অযাচিত অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দুই পর্বে ভোট চলাকালে দিনভর বিএনপি ভোটে জোরজবরদস্তি বা কারচুপির অভিযোগ আসলেও শেষে ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, আওয়ামী লীগের তুলনায় দলটি এগিয়ে ছিল। তাহলে কেন কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছিল-এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে সময় বলেছিলেন, তারা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে এমন অভিযোগ করেছিলেন।

কিন্তু এভাবে কেবল চাপ তৈরির জন্য অভিযোগ করা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ভালো নয় বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেছেন, রংপুরে নির্বাচন পুরোপুরি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনকেও বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সুক্ষ্ম কারচুপির কথা বলেছে।

‘নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরে অভিযোগ করাটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা যদি অনুধাবন করে সুদূরপ্রসারী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, মানসিকতার যদি পরিবর্তন ঘটায় তবে এ থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। নইলে এটা আরও খারাপ দিকে যাবে।’

রংপুর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতিই হচ্ছে নেতিবাচক। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সমরিক উর্দি পরে দল গঠন করছে। এই দলটা সময় ষড়যন্ত্র চক্রান্তের পথেই গিয়েছে, তাদের মনমানসিকতা সবসময় নেতিবাচক।’

হানিফ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময় নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লার নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে সারাদিন তারা বলল ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে, কিন্তু ফলাফলের পর যখন দেখল তাদের প্রার্থী হেরে যাচ্ছে, তখন বলা শুরু করল নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। আবার কুমিল্লায় সুন্দর পরিবেশে ভোট হলো। সারা দিন কারচুপির অভিযোগ, নির্বাচনে জয় লাভ করে বলল কারচুপি না হলে আরও বেশি ভোট পেত। এই সমস্ত বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্য প্রমাণ করে তারা মিথ্যাচারের রাজনীতিতে তারা আবদ্ধ ‘

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘নির্বাচনে হারলে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিএনপির একটা বদ অভ্যাস। বিএনপি সকল ব্যাপারে অধিকাংশ সময় তারা অসত্য কথা বলে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘নির্বাচনে যদি কারচুপি হয়, সেটি যারা দেখতে পারে বুঝতে পারে তারা যদি সেটি বলে, সেটা তো অমূলক না। তারা সেটা বলতেই পারে।’

রংপুর সিটি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বিএনপি কোত্থেকে পেল-এমন প্রশ্নে দুদু বলেন, ‘রংপুরে যে নির্বাচনটা হলো, সেই নির্বাচনে আমার নিজের যেটা মনে হয়েছে যে এরশাদ এমন কোন মহৎ কাজ করে নাই যাতে এতো ভোটে তার প্রার্থী জয় লাভ করবে।’

শুধু এমন ধারণা থেকে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ করা যায় কি না- জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘রংপুরের সিটি নির্বাচন শু্ধুই ভয়ঙ্কর একটি নির্বাচনই নয়, এই নির্বাচন ফ্যাসিবাদী সরকারের অবস্থান থেকে যে ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা আগামী দিনে ভালো কোন ফল বয়ে আনবে না। ভালো ফল তখনই আসবে সকলে মিলে সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক একটি নির্বাচনের জন্য আলোচনা করে নির্বাচন করলে।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানাতে হবে, এটাই আমাদের স্বপ্ন: পার্থ

রংপুরের ভোটারদের অপমান করেছে বিএনপি: স্থানীয় বিশেষজ্ঞ

আপডেট সময় ০৩:১৪:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি রংপুরের ভোটারদের সঙ্গে ন্যয়সঙ্গত আচরণ করেনি বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার নিয়ে কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি মনে করেন, বিএনপির এই অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না। আর রংপুরে দলটি এবার যে ভোট পেয়েছে, তাতে তাদের খুশি হওয়ার কথা ছিল।

বৃহস্পতিবার উত্তরের জেলা রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের দিকে দৃষ্টি ছিল গোটা দেশেরই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি-তিন দলের প্রার্থীই এই নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশায় লড়াই করছিলেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট ও সমমনাদের বর্জনের পর থেকেই বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ভোটারদের বাধা দেয়ার মতো ঘটনা ফিরে আসায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আগের কমিশন এ বিষয়ে জোরাল পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা আছে।

তবে গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়া কে এম নুরুল হুদা কমিশন ভোটে কারচুপির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সুষ্ঠু ভোট করার কথা বলছে। এই কমিশনের অধীনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর এবার রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলো। কুমিল্লায় কয়েকটি কেন্দ্রে গোলযোগের ঘটনা ঘটলেও রংপুরে সেটা হয়নি। ১৯৩ কেন্দ্রের প্রতিটিতেই ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণ। নাগরিকদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগের কথা উঠে আসেনি গণমাধ্যমে। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে ভোটের পরিস্থিতি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে, সেখানেও কোনো কারচুপির অভিযোগ করেনি কোনো পক্ষ।

তবে ঢাকায় দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ তুলেছেন কারচুপির। তিনি দাবি করেছেন, তাদের এজেন্টদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে।

ভোটের পরদিন শুক্রবার রাজধানীতে এক কর্মসূচিতে রিজভী এমনও দাবি করেন, ভোটের সকালেই ক্ষমতাসীন দল ও জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা কেন্দ্র দখল করে দিনভর সিল মেরেছে। গণমাধ্যম কর্মীদেরকে কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি বলে তারা এসব চিত্র তুলে ধরতে পারেনি বলেও অভিযোগ তার।

বাংলাদেশে ভোটে হারলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার রীতি আছে বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে। এমনও দেখা গেছে, ফলাফল ঘোষণার আগে তা প্রত্যাখ্যান করা দল ভোটে জিতেছে। এরপর অবশ্য তারা সুর পাল্টেছে। নির্বাচন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বরাবর রাজনৈতিক দলের এমন মনোভাবের সমালোচনা করে আসছেন। তারা একে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি বাধা হিসেবেই দেখছেন।

রংপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়াকেও বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। এই দুই বিশেষজ্ঞই নানা সময় নির্বাচনে কারচুপির ঘটনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা সময় নানা পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

রংপুর নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি হয়েছে বলে মনে করেন না এই দুই বিশিষ্ট জন।

তোফায়েল আহমেদ দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘রংপুরের সিটি নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করছে যে, এই নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। এটা তাদের নিজের একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টিকে আমি রাজনীতির অপেশাদারিত্ব হিসেবে দেখছি, বিএনপি এ বিষয়ে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে।’

‘একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এটা আমরা আশা করি না। রংপুর নির্বাচন নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে সেটা কারো ব্যক্তিগত বক্তব্য হয়ে থাকতে পারে।’

রংপুরে বিএনপির অবস্থান বরাবরই দুর্বল। ১৯৯০ সাল থেকে কোনো নির্বাচনেই তারা ভালো করতে পারেনি। বরং বেশিরভাগ নির্বাচনেই তাদের প্রার্থীরা সেখানে জামানত হারিয়েছেন। এবারও বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে না পারলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, ভোটের ফলাফলে বিএনপির খুশি হওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘গত নির্বাচনে (২০১২ সালের মেয়র নির্বাচনে) বিএনপির প্রার্থী এখানে ভোট পেয়েছিল ২১ হাজার, এ নির্বাচনে তারা পেয়েছে ৩৫ হাজার ভোট। রংপুরের মানুষ বিএনপিকে বিমুখ করে নাই, সে মানুষগুলোকে তাদের অবমাননা করা তাদের উচিত হয়নি।’

‘তাদের তো রংপুরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো উচিত ছিল, ভোট দেওয়ার জন্য রংপুরের মানুষকে অভিনন্দন জানানো উচিত ছিল। এই মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারি দলের আঁতাত-ফাতাত সেগুলো বলতে পারত। কিন্তু তা না করে কারচুপির অভিযোগ এনে বক্তব্য দেয়াটা তাদের ঠিক হয়নি।’

‘বিএনপির সংবাদ সম্মেরনে বক্তব্যটি আগে থেকে লেখা ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।’

ভোট নিয়ে বিরোধী দলের ঢালাও অভিযোগ বরাবরই চলে আসছে বাংলাদেশে। ভোটে সরকারি দলের কারচুপির অভিযোগের পাশাপাশি ভালো ভোটের ক্ষেত্রে অযাচিত অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দুই পর্বে ভোট চলাকালে দিনভর বিএনপি ভোটে জোরজবরদস্তি বা কারচুপির অভিযোগ আসলেও শেষে ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, আওয়ামী লীগের তুলনায় দলটি এগিয়ে ছিল। তাহলে কেন কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছিল-এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে সময় বলেছিলেন, তারা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে এমন অভিযোগ করেছিলেন।

কিন্তু এভাবে কেবল চাপ তৈরির জন্য অভিযোগ করা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ভালো নয় বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেছেন, রংপুরে নির্বাচন পুরোপুরি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনকেও বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সুক্ষ্ম কারচুপির কথা বলেছে।

‘নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরে অভিযোগ করাটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা যদি অনুধাবন করে সুদূরপ্রসারী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, মানসিকতার যদি পরিবর্তন ঘটায় তবে এ থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। নইলে এটা আরও খারাপ দিকে যাবে।’

রংপুর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতিই হচ্ছে নেতিবাচক। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সমরিক উর্দি পরে দল গঠন করছে। এই দলটা সময় ষড়যন্ত্র চক্রান্তের পথেই গিয়েছে, তাদের মনমানসিকতা সবসময় নেতিবাচক।’

হানিফ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময় নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লার নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে সারাদিন তারা বলল ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে, কিন্তু ফলাফলের পর যখন দেখল তাদের প্রার্থী হেরে যাচ্ছে, তখন বলা শুরু করল নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। আবার কুমিল্লায় সুন্দর পরিবেশে ভোট হলো। সারা দিন কারচুপির অভিযোগ, নির্বাচনে জয় লাভ করে বলল কারচুপি না হলে আরও বেশি ভোট পেত। এই সমস্ত বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্য প্রমাণ করে তারা মিথ্যাচারের রাজনীতিতে তারা আবদ্ধ ‘

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘নির্বাচনে হারলে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিএনপির একটা বদ অভ্যাস। বিএনপি সকল ব্যাপারে অধিকাংশ সময় তারা অসত্য কথা বলে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘নির্বাচনে যদি কারচুপি হয়, সেটি যারা দেখতে পারে বুঝতে পারে তারা যদি সেটি বলে, সেটা তো অমূলক না। তারা সেটা বলতেই পারে।’

রংপুর সিটি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বিএনপি কোত্থেকে পেল-এমন প্রশ্নে দুদু বলেন, ‘রংপুরে যে নির্বাচনটা হলো, সেই নির্বাচনে আমার নিজের যেটা মনে হয়েছে যে এরশাদ এমন কোন মহৎ কাজ করে নাই যাতে এতো ভোটে তার প্রার্থী জয় লাভ করবে।’

শুধু এমন ধারণা থেকে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ করা যায় কি না- জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘রংপুরের সিটি নির্বাচন শু্ধুই ভয়ঙ্কর একটি নির্বাচনই নয়, এই নির্বাচন ফ্যাসিবাদী সরকারের অবস্থান থেকে যে ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা আগামী দিনে ভালো কোন ফল বয়ে আনবে না। ভালো ফল তখনই আসবে সকলে মিলে সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক একটি নির্বাচনের জন্য আলোচনা করে নির্বাচন করলে।’