ঢাকা ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময় ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের শান্তিতে নির্বাচন করতে দেব না: আসিফ মাহমুদ ‘আমি রুমিন ফারহানা, আমার কোনো দল লাগে না’ গুম হওয়া পরিবারের আর্তনাদ শুনে কাঁদলেন তারেক রহমান কালি নয়, জুলাই জাতীয় সনদ ‘রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে’ লেখা হয়েছে : আলী রীয়াজ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী ওসমানী মেডিকেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলা, চলছে কর্মবিরতি নির্বাচন ব্যর্থ হলে শুধু সরকার নয়, পুরো দেশবাসীকেই এর ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে : দুদু আন্দোলনের সুফল একটি দলের ঘরে নেওয়ার চেষ্টা বিফলে যাবে : ডা. জাহিদ ঢাকাকে হারিয়ে প্লে-অফ নিশ্চিত করল রংপুর রাইডার্স

আইএস জঙ্গিরা পরবর্তী ঘাঁটি গাড়ছেন সৌদি আরব

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির প্রধান নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ক্রমেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছেন। নিত্যনতুন সব সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন।

একের পর নাটকীয় সব ঘটনা ঘটছে। তার নেতৃত্বে সৌদি আরবে ব্যাপক পরিবর্তনের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। এই ঢেউয়ে দুলছে সৌদি রাজপরিবার, সৌদি জনগণ একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ।

তিনি দেশের অভ্যন্তরে যেমন বিভিন্ন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, দেশের বাইরেও নতুন শক্তিবলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছেন।

রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়াস, বা এ বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশাল সামরিক চুক্তি অথবা মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক জোট গঠন এসবই সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্ব লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব নিজস্ব ক্ষমতার অক্ষ তৈরি করায় আগ্রহী।

এ ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা শক্তির সমর্থনও পাচ্ছে। ইরান-তুরস্ক-সিরিয়ার অলিখিত জোটের বিপরীতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে নয়া জোটের উত্থান পশ্চিমা শক্তিরও চাওয়া। পশ্চিমা শক্তিগুলো মনে করছে, এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারসাম্য আসবে। সৌদি কূটনীতির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোয় মিলছে তারই আভাস।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ মারা যাবার পর সালমান বিন আব্দুল আজিজ সৌদি আরবের বাদশাহ হন। তিনি ক্ষমতাসীন হাবার পর তাৎক্ষনিক-ভাবে দুটো সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, তার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা।

তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাবার পরেই ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে শুরু হয় সামরিক অভিযান। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গত দুই বছর ধরে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চললেও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। সৌদি আরব এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

ওদিকে বাদশাহ সালমান ক্ষমতা লাভের পরপরই সৌদি পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তনে কাজ শুরু করেন, যা ‘সালমান ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। শুরু থেকেই তিনি দীর্ঘদিনের রক্ষণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে আক্রমণাত্মক নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন।

চলতি বছর সৌদি আরবের সামরিক খাতে ব্যয় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, যা পরিমাণে ৫০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাব অনুসারে, সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে ২০১৬ সালে সৌদি আরব বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে ছিল।

সৌদি আরবের সমরাস্ত্র সংগ্রহের ধারা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, বাদশাহ সালমান ‘সফট পাওয়ার’-এর বদলে ‘হার্ড পাওয়ার’-এর প্রয়োগেই বেশি আগ্রহী। যেমন তার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায়ই সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো অংশগ্রহণ ছাড়াই সৌদি নেতৃত্বে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) জোট ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে মার্চ থেকে লড়াই করছে।

সালমান ডকট্রিনের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব খর্ব করা। বৈরুত থেকে সানা পর্যন্ত ইরান অনুসারীদের শায়েস্তা করা। এছাড়া বিপরীত মেরুর অন্য দেশগুলোতে সরাসরি হামলা বা বিদ্রোহীদের উসকে দেওয়া এবং নিজস্ব বলয়ের দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়াও এই ডকট্রিনের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে উসকে দিতে চায়। কারণ, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হচ্ছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ ইরান।

ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্ভব। তাই সৌদি আরবকে ইরানের মুখোমুখি দাঁড় করানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার বলে একটি কৌশল অবলম্বন করে রাষ্ট্রগুলো। একই রকম আরেকটি কৌশল হচ্ছে ছায়া নিরাপত্তা বা প্রক্সি সিকিউরিটি।

এক্ষেত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে অন্য কাউকে উসকে দিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল অবলম্বন করে চতুর রাজনীতিকগণ। আরবের রাজনীতিতে মিসর দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ দেখভাল করেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ বিভিন্ন কারণে মিসরের প্রভাব এখন ম্রিয়মাণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দরকার এমন এক নতুন মিত্র, যার মুসলিমদেশগুলোয় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আছে। সৌদি আরব পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।

এখন সৌদি আরব মিসরের পরিবর্তে ইসরায়েলের ছায়া নিরাপত্তার কাজ করছে। যেখানে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা হওয়ার কথা ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে, সেটি এখন হচ্ছে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের আড়ালে। বাদশাহ সালমান রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইরান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছেন।

আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ইরানকে যেন সহায়তা না দেওয়া হয়। ইরান ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠলে আরবের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে বলে বাদশাহ সালমান প্রেসিডেন্ট পুতিন বরাবর অভিযোগও করেছেন।

কিন্তু এত কৌশল অবলম্বন ও দৌড়ঝাঁপ করে কি ইতিবাচক কোনো ফায়দা হচ্ছে সৌদি আরবের? বিশেষজ্ঞরা কিন্তু তেমনটি মনে করছেন না। অনেকগুলা বিষয় সামলে নিয়ে সৌদি আরবকে আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার পথে এগোতে হবে।

ইয়েমেনে দ্বন্দ্ব সংঘাত, ইরাক যুদ্ধ ও সিরিয়ার সংঘাত এ তিনটি ঘটনায়ই সৌদি আরব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তিন জায়গাতেই সৌদি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই এখন সৌদি আরবের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

সিরিয়া ও ইরাকে ক্রমশ ভূমি হারানো আইএস যোদ্ধারা এখন কোথায় যাবে? সৌদি আরব জঙ্গিদের পরবর্তী চারণভূমি হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। তখন সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বকে পাশে পাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েই যায়।

বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সৌদি আরব পরিস্থিতির শিকার হয়ে যায় কি না এবং নতুন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। লক্ষণগুলো বলছে, নিজের খেলায় সৌদি শাসকেরা নিজেরাই ধরা খাচ্ছেন! (চলবে)

সহযোগিতায়: ইসরাত বিনতে ওয়াহিদ, গবেষক, লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স-এর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ থেকে এমএসসি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময়

আইএস জঙ্গিরা পরবর্তী ঘাঁটি গাড়ছেন সৌদি আরব

আপডেট সময় ১১:৪১:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৭

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির প্রধান নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ক্রমেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছেন। নিত্যনতুন সব সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন।

একের পর নাটকীয় সব ঘটনা ঘটছে। তার নেতৃত্বে সৌদি আরবে ব্যাপক পরিবর্তনের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। এই ঢেউয়ে দুলছে সৌদি রাজপরিবার, সৌদি জনগণ একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ।

তিনি দেশের অভ্যন্তরে যেমন বিভিন্ন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, দেশের বাইরেও নতুন শক্তিবলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছেন।

রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়াস, বা এ বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশাল সামরিক চুক্তি অথবা মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক জোট গঠন এসবই সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্ব লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব নিজস্ব ক্ষমতার অক্ষ তৈরি করায় আগ্রহী।

এ ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা শক্তির সমর্থনও পাচ্ছে। ইরান-তুরস্ক-সিরিয়ার অলিখিত জোটের বিপরীতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে নয়া জোটের উত্থান পশ্চিমা শক্তিরও চাওয়া। পশ্চিমা শক্তিগুলো মনে করছে, এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারসাম্য আসবে। সৌদি কূটনীতির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোয় মিলছে তারই আভাস।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ মারা যাবার পর সালমান বিন আব্দুল আজিজ সৌদি আরবের বাদশাহ হন। তিনি ক্ষমতাসীন হাবার পর তাৎক্ষনিক-ভাবে দুটো সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, তার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা।

তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাবার পরেই ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে শুরু হয় সামরিক অভিযান। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গত দুই বছর ধরে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চললেও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। সৌদি আরব এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

ওদিকে বাদশাহ সালমান ক্ষমতা লাভের পরপরই সৌদি পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তনে কাজ শুরু করেন, যা ‘সালমান ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। শুরু থেকেই তিনি দীর্ঘদিনের রক্ষণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে আক্রমণাত্মক নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন।

চলতি বছর সৌদি আরবের সামরিক খাতে ব্যয় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, যা পরিমাণে ৫০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাব অনুসারে, সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে ২০১৬ সালে সৌদি আরব বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে ছিল।

সৌদি আরবের সমরাস্ত্র সংগ্রহের ধারা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, বাদশাহ সালমান ‘সফট পাওয়ার’-এর বদলে ‘হার্ড পাওয়ার’-এর প্রয়োগেই বেশি আগ্রহী। যেমন তার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায়ই সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো অংশগ্রহণ ছাড়াই সৌদি নেতৃত্বে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) জোট ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে মার্চ থেকে লড়াই করছে।

সালমান ডকট্রিনের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব খর্ব করা। বৈরুত থেকে সানা পর্যন্ত ইরান অনুসারীদের শায়েস্তা করা। এছাড়া বিপরীত মেরুর অন্য দেশগুলোতে সরাসরি হামলা বা বিদ্রোহীদের উসকে দেওয়া এবং নিজস্ব বলয়ের দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়াও এই ডকট্রিনের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে উসকে দিতে চায়। কারণ, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হচ্ছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ ইরান।

ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্ভব। তাই সৌদি আরবকে ইরানের মুখোমুখি দাঁড় করানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার বলে একটি কৌশল অবলম্বন করে রাষ্ট্রগুলো। একই রকম আরেকটি কৌশল হচ্ছে ছায়া নিরাপত্তা বা প্রক্সি সিকিউরিটি।

এক্ষেত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে অন্য কাউকে উসকে দিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল অবলম্বন করে চতুর রাজনীতিকগণ। আরবের রাজনীতিতে মিসর দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ দেখভাল করেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ বিভিন্ন কারণে মিসরের প্রভাব এখন ম্রিয়মাণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দরকার এমন এক নতুন মিত্র, যার মুসলিমদেশগুলোয় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আছে। সৌদি আরব পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।

এখন সৌদি আরব মিসরের পরিবর্তে ইসরায়েলের ছায়া নিরাপত্তার কাজ করছে। যেখানে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা হওয়ার কথা ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে, সেটি এখন হচ্ছে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের আড়ালে। বাদশাহ সালমান রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইরান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছেন।

আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ইরানকে যেন সহায়তা না দেওয়া হয়। ইরান ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠলে আরবের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে বলে বাদশাহ সালমান প্রেসিডেন্ট পুতিন বরাবর অভিযোগও করেছেন।

কিন্তু এত কৌশল অবলম্বন ও দৌড়ঝাঁপ করে কি ইতিবাচক কোনো ফায়দা হচ্ছে সৌদি আরবের? বিশেষজ্ঞরা কিন্তু তেমনটি মনে করছেন না। অনেকগুলা বিষয় সামলে নিয়ে সৌদি আরবকে আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার পথে এগোতে হবে।

ইয়েমেনে দ্বন্দ্ব সংঘাত, ইরাক যুদ্ধ ও সিরিয়ার সংঘাত এ তিনটি ঘটনায়ই সৌদি আরব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তিন জায়গাতেই সৌদি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই এখন সৌদি আরবের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

সিরিয়া ও ইরাকে ক্রমশ ভূমি হারানো আইএস যোদ্ধারা এখন কোথায় যাবে? সৌদি আরব জঙ্গিদের পরবর্তী চারণভূমি হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। তখন সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বকে পাশে পাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েই যায়।

বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সৌদি আরব পরিস্থিতির শিকার হয়ে যায় কি না এবং নতুন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। লক্ষণগুলো বলছে, নিজের খেলায় সৌদি শাসকেরা নিজেরাই ধরা খাচ্ছেন! (চলবে)

সহযোগিতায়: ইসরাত বিনতে ওয়াহিদ, গবেষক, লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স-এর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ থেকে এমএসসি।