আকাশ নিউজ ডেস্ক:
সাড়ে চার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের নানা উত্থান-পতন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মিশরের গিজার গ্রেট পিরামিড। ১৯৯২ সালের ৫.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পসহ অসংখ্য প্রলয়ঙ্কারী ভূকম্পন আছড়ে পড়েছে এর গায়ে। সেসব দুর্যোগে পিরামিডের বাইরের কিছু আবরণ খসে পড়লেও এর মূল কাঠামো বা কোর থেকেছে সম্পূর্ণ অক্ষত। যুগের পর যুগ ধরে গবেষকদের মনে প্রশ্ন ছিল, কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া কীভাবে এই প্রাচীন স্থাপত্য কালজয়ী হয়ে টিকে রইল। সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই রহস্যের জট খুলেছেন মিশরীয় ভূ-পদার্থবিদ অসেম সালামা এবং তাঁর গবেষক দল।
গবেষণায় দেখা গেছে, পিরামিডটি টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এর নিজস্ব কম্পন তরঙ্গের সঙ্গে মাটির কম্পন তরঙ্গের অমিল (সিসমিক ফ্রিকোয়েন্সি মিসম্যাচ)। গবেষকরা পিরামিডের ভেতরের ও বাইরের ৩৭টি ভিন্ন স্থানে সূক্ষ্ম পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, এর নিজস্ব স্বাভাবিক কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে ২.০ থেকে ২.৬ হার্টজ। অথচ এর চারপাশের মাটির প্রধান ফ্রিকোয়েন্সি মাত্র ০.৬ হার্টজ। কোনো ভূমিকম্পের সময় যদি মাটির কম্পন আর ভবনের কম্পনের মাত্রা মিলে যায়, তবে সেখানে অনুনাদ তৈরি হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ভবনকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু পিরামিডের ক্ষেত্রে মাটি ও স্থাপনার ফ্রিকোয়েন্সি সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় ভূমিকম্পের ধ্বংসাত্মক শক্তি এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না এবং কাঠামোকে বড় কোনো আঘাত থেকে রক্ষা করে। বাতাস, গাড়ি এবং মানুষের চলাচলের ফলে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র কম্পন পরিমাপের বিশেষ পদ্ধতি ‘এইচভিএসআর’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফ্রিকোয়েন্সির এই অমিল ছাড়াও পিরামিডের ভেতরের নিজস্ব নকশা একে এক অনন্য সুরক্ষাকবচ দিয়েছে। এর ভেতরে থাকা কিংস চেম্বারের ঠিক ওপরে রয়েছে বিশেষ কিছু কক্ষ, যা মূলত অভ্যন্তরীণ ধাক্কা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এই চেম্বারগুলো ভূমিকম্পের শক্তিকে ভেতরেই শুষে বা কমিয়ে ফেলে, যার ফলে মূল কাঠামো কোনো বড় ঝাঁকুনি অনুভব করে না। একই সঙ্গে পিরামিড তৈরিতে ব্যবহৃত গ্রানাইট পাথরের ভূমিকাও কম নয়। এই পাথরে প্রচুর পরিমাণে কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল থাকায় এবং এর আণবিক গঠন অত্যন্ত ঘন হওয়ায়, এটি সিসমিক তরঙ্গকে শুষে নেওয়ার বদলে প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়।
অবশ্য আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যায় ভূমিকম্প সহনশীলতার জন্য কেবল ফ্রিকোয়েন্সির ওপর নির্ভর করা হয় না, বরং ভবনের ওজন, নমনীয়তা এবং ভরকেন্দ্রকেও বিবেচনা করা হয়। সেই দিক থেকেও গিজার পিরামিডের নকশা ছিল অতুলনীয়। এর প্রশস্ত ভিত্তি বা চওড়া বেজ, নিচের দিকে থাকা নিম্ন ভরকেন্দ্র এবং ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়া প্রতিসাম্য বা সুষম নকশা একে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে অটল রেখেছে। এই নতুন গবেষণা প্রমাণ করে, হাজার হাজার বছর আগেই পিরামিডের নির্মাতারা অত্যন্ত দূরদর্শী ও কার্যকর প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা আজও আধুনিক বিজ্ঞানকে চমকে দিচ্ছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























