আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ (ধাত্রী) প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ঐতিহাসিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মিডওয়াইফ সংঘের (আইসিএম) ৩৪তম ত্রিবার্ষিক কংগ্রেসে বাংলাদেশ এই বৃহৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় দেশে ২৫ হাজারেরও বেশি নতুন মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি হবে, যা মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বের বৃহত্তম মিডওয়াইফ সমাবেশ ‘৩৪তম আইসিএম ত্রিবার্ষিক কংগ্রেস’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং ইউএনএফপিএর বৈশ্বিক নির্বাহী পরিচালক ডিয়েন কেইটা যৌথভাবে বাংলাদেশের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডিয়েন কেইটা বাংলাদেশকে পেশাদার মিডওয়াইফ গঠনে একটি ‘পথপ্রদর্শক’ দেশ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মিডওয়াইফারি অ্যাক্সিলারেটরে নেতৃত্বদানকারী অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
লিসবনের মঞ্চে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে মিডওয়াইফদের পেছনে বিনিয়োগ করা মানে মানুষের জীবন রক্ষায় বিনিয়োগ করা। এই যুগান্তকারী অঙ্গীকার একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে—মাতৃমৃত্যু কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়।’
উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার মায়ের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে, যারা বর্তমানে প্রতিরোধযোগ্য কারণেই সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে যেখানে ৫৭৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো, বর্তমানে সেই হার কমে ১৩৬-এ নেমে এসেছে। তবে এখনও দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ প্রসব বাড়িতে সম্পন্ন হয় এবং ৬ হাজার ২১৫টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত মিডওয়াইফের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৫৫৭ জন, যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষ মিডওয়াইফরা একাই অপরিহার্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃ ও নবজাতক পরিচর্যা এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্রদান করতে সক্ষম। পাশাপাশি তারা মাতৃ ও নবজাতকের দুই-তৃতীয়াংশ মৃত্যুঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই খাত অত্যন্ত লাভজনক—মিডওয়াইফ সেবায় বিনিয়োগ করা প্রতি ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৬ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।
সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরোধমূলক ও আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা মিডওয়াইফদের ক্ষমতায়ন করি, তখন আমরা নারীদের ক্ষমতায়ন করি। আর নারীরা ক্ষমতায়িত হলে পরিবার শক্তিশালী হয়, পরিবার শক্তিশালী হলে সমগ্র জাতিও আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।’
গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি পর্তুগালে বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স লায়লা মুনতাজেরী দীনা এবং দূতালয় প্রধান এস. এম. গোলাম সরোয়ারও উপস্থিত ছিলেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















