আকাশ নিউজ ডেস্ক:
সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে বুকে বাচ্চা জড়িয়ে ধরে আছে সামুদ্রিক ভোঁদড়। সামাজিকমাধ্যমে এসব ছবি ও ভিডিও নিয়মিতই মানুষের মন জয় করে নেয়। তাদের শান্ত, আদুরে আর পারিবারিক আচরণ দেখে অনেকেই মুগ্ধ হন। কিন্তু এই মিষ্টি চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর এবং কিছুটা নির্মম এক বাস্তবতা।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে টানা সাত বছর ধরে ১৩টি পুরুষ ভোঁদড় এবং ৫০টি মা-শাবক জুটির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন ‘মন্টেরি বে অ্যাকোয়ারিয়াম’-এর গবেষক মেরিয়েন রিডম্যান। গবেষণায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য। মা ভোঁদড় যখন সমুদ্রের গভীরে খাবার সংগ্রহ করতে ডুব দেয়, তখন সুযোগ বুঝে কিছু পুরুষ ভোঁদড় শাবককে ছিনিয়ে নেয়। এরপর মা খাবার নিয়ে না ফেরা পর্যন্ত তারা শাবককে পানির নিচে চেপে ধরে রাখে বা ভয় দেখায়। অনেক ক্ষেত্রে শাবককে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে মায়ের কাছ থেকে খাবার আদায় করে নেয় তারা। আচরণটি অনেকটা মুক্তিপণ আদায়ের মতো।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৌশল ব্যবহার করে একটি পুরুষ ভোঁদড় তার মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। আচরণটি এতটাই নিয়মিত ও স্বতন্ত্র যে গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘হোস্টেজ বিহেভিয়ার’ বা ‘জিম্মি আচরণ’।
এর পেছনে কী কারণ?
সামুদ্রিক ভোঁদড় উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ছোট সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি। পূর্ণবয়স্ক একটি ভোঁদড়ের দৈর্ঘ্য চার ফুট পর্যন্ত এবং ওজন প্রায় ৯০ পাউন্ড হতে পারে। কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে তাদের প্রতিদিন নিজের ওজনের প্রায় ২৫ শতাংশ সমপরিমাণ খাবার খেতে হয়।
বর্তমানে সামুদ্রিক ভোঁদড় তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলের মাত্র ১৩ শতাংশ এলাকায় টিকে আছে। ফলে সীমিত এলাকায় খাদ্যের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, খাদ্যসংকট ও প্রতিযোগিতার চাপই এমন আচরণের অন্যতম কারণ।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা ক্রুজের সামুদ্রিক বিজ্ঞান গবেষকরা জানান, ভোঁদড় আসলে ব্যাজার, ফেরেট এবং উলভারিনের ঘনিষ্ঠ বিবর্তনীয় আত্মীয়। বাহ্যিকভাবে শান্ত মনে হলেও তারা স্বভাবে বেশ আক্রমণাত্মক হতে পারে। তাদের চোয়াল ও কামড়ের শক্তি এত বেশি যে হাড় পর্যন্ত ভেঙে দিতে সক্ষম। এ কারণেই ভোঁদড় নিয়ে কাজ করা অনেক গবেষক তাদের ‘সমুদ্রের উলভারিন’ বলেও উল্লেখ করেন।
অস্তিত্ব সংকটে ভোঁদড়-
১৯৭৭ সাল থেকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সামুদ্রিক ভোঁদড়কে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজারে নেমে এসেছে। অথচ একসময় উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে এদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক দেড় লাখ থেকে তিন লাখের মধ্যে। ১৮ ও ১৯ শতকে মূল্যবান পশমের জন্য ব্যাপক শিকারের কারণে সামুদ্রিক ভোঁদড় প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়ে। সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও নতুন করে নানা হুমকির মুখে পড়েছে প্রাণীটি।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হাঙরের আক্রমণ, রোগের বিস্তার এবং খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন তাদের অস্তিত্বকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সামুদ্রিক ভোঁদড় না হলেও বাংলাদেশের সুন্দরবনে মসৃণ-লোমযুক্ত ভোঁদড়সহ কয়েকটি প্রজাতির ভোঁদড় পাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার কিছু জেলে মাছ ধরার কাজে প্রশিক্ষিত ভোঁদড় ব্যবহার করে আসছেন বলেও জানা যায়।
তবে পরিবেশবাদী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব ন্যাচার-এর তথ্য অনুযায়ী, আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ এবং শিকারের কারণে বাংলাদেশেও ভোঁদড়ের কয়েকটি প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























