আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
এখন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধ দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের পর এই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। রিয়াদ এখন মার্কিন বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ডে আরও বেশি সামরিক সুবিধা ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের পদধ্বনি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান ড্রোন ও মিসাইল হামলার প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন এখন সৌদি আরবের অভ্যন্তরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বিস্তৃত করছে। বিশেষ করে পশ্চিম সৌদি আরবের তায়েফ শহরে অবস্থিত কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটিটি এখন মার্কিন বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কৌশলগতভাবে এই ঘাঁটিটি ইরানি শাহেদ ড্রোনগুলোর আওতার বাইরে এবং লজিস্টিক হাব হিসেবে পরিচিত জেদ্দা বন্দরের খুব কাছে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর লোহিত সাগরের এই বন্দরটি মার্কিন সামরিক রসদ সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্রমতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে এশিয়া থেকে হাজার হাজার মার্কিন স্থল সেনা এই অঞ্চলের দিকে রওনা হয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শুরুতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে না চাইলেও বর্তমানে তাদের অবস্থানে আমূল পরিবর্তন এসেছে। রিয়াদের নীতি নির্ধারকরা এখন মনে করছেন, গত কয়েক সপ্তাহে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক এলাকায় ইরানের যে ধরনের হামলা হয়েছে, তার জন্য তেহরানকে কঠোর সামরিক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। এই মনোভাবের কারণেই মার্কিন বাহিনীকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুদ্ধের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রস্তুতির প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছে। আমিরাতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছেন, তারা অন্তত নয় মাস পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমিরাত কয়েকশ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। দুবাই ছেড়ে আসা প্রবাসীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা কমাতে আমিরাত এখন মার্কিন রণকৌশলের সঙ্গে নিজেদের একীভূত করছে।
এদিকে কাতারও এই সংঘাতের ভয়াবহ আঁচ থেকে রক্ষা পায়নি। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত এই দেশটি ইরানের হামলায় তাদের বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস শোধনাগার রাস লাফানের বড় ধরনের ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেছে। দক্ষিণ পর্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইরান কাতারের এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়, যা মেরামত করতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এই ঘটনাটি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি করেছে, সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে নিরাপদ নয়।
তবে ওমানের মতো কিছু দেশ এখনও মনে করছে, ইসরায়েল আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবৈধ যুদ্ধে টেনে নামিয়েছে। ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এটি আমেরিকার যুদ্ধ এবং এখানে আরব দেশগুলোর খুব সামান্যই পাওয়ার আছে। কিন্তু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ইরানকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কঠোর ও যুদ্ধংদেহি বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, ইরান বারবার আলোচনার সুযোগ হাতছাড়া করেছে এবং তাদের ‘জঘন্য’ আচরণের বিপরীতে সৌদি আরব এখন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব বর্তমানে একটি অত্যন্ত জটিল ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার হয়ে নিজেদের ‘প্যান্ডোরাস বক্স’ বা বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চায় না, অন্যদিকে তারা চায় না যে যুদ্ধের পরে ইরান এই অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করুক। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হায়কেল মনে করেন, মার্কিন বিমান বাহিনী যদি বিমানবাহী রণতরীর বদলে সৌদি আরবের ধাহরান ঘাঁটি থেকে অভিযান চালায়, তবে যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যাবে। উপকূলীয় এই শহরটি ইরান থেকে মাত্র ১৩০ মাইল দূরে অবস্থিত হওয়ায় এটি হবে তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। ইরান যেভাবে বিশ্বের মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ পরিবহন করা এই জলপথটি নিজের দখলে নিয়েছে, তা মোকাবিলায় সৌদি আরব ও আমিরাত একটি যৌথ প্রাণঘাতী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ভাবছে। যদিও ইসরায়েল চাচ্ছে আরব রাজতন্ত্রগুলোকে এই যুদ্ধে সরাসরি টেনে নামাতে, তবুও রিয়াদ ও আবুধাবি চাচ্ছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইরানের ওপর কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















