আকাশ নিউজ ডেস্ক:
ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা বা এলিয়েনদের অস্তিত্ব নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা জল্পনা-কল্পনা এবার নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন যেখানে তিনি ভিনগ্রহের প্রাণী ও অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু বা ইউএফও সংক্রান্ত সমস্ত গোপন ফাইল জনসমক্ষে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জাল ছিঁড়ে সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন মহাকাশপ্রেমীরা। তিনি ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সরকারের কাছে থাকা প্রতিটি তথ্য যাচাই করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ ও ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা অভিযোগ করে আসছিলেন, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তা লুকিয়ে রাখছে। বিশেষ করে পেন্টাগন এবং নাসার মতো সংস্থাগুলো বারবার ভিনগ্রহের প্রযুক্তির কথা অস্বীকার করলেও জনসাধারণের কৌতূহল দমে যায়নি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলটদের ক্যামেরায় ধরা পড়া অদ্ভুত সব মহাজাগতিক দৃশ্যের ভিডিও এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। এখন ট্রাম্পের এই নতুন নির্বাহী আদেশ সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আধুনিক ইতিহাসে এলিয়েন বা ইউএফও দেখার ঘটনাগুলো মূলত বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপকতা পায়। ১৯৪৭ সালের নিউ মেক্সিকোর রসওয়েল ঘটনাটি এই তালিকায় সবচেয়ে উপরে রয়েছে, যেখানে একটি উড়ন্ত চাকতি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী তখন একে আবহাওয়া বেলুন বলে ধামাচাপা দিয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকরা বরাবরই সেখানে ভিনগ্রহের যান এবং ভিনগ্রহীদের দেহ উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছেন। এই একটি ঘটনাই বিশ্বজুড়ে এলিয়েন সংস্কৃতি ও সরকারি গোপনীয়তার প্রতি মানুষের অবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বরাবরই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। ১৯৬১ সালে ফ্রাঙ্ক ড্রেকের দেওয়া বিখ্যাত সমীকরণটি আকাশগঙ্গার মতো ছায়াপথে কতগুলো উন্নত সভ্যতা থাকতে পারে তার একটি ধারণা দেয়। যদিও এই সমীকরণ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি, তবুও এটি প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের বিশালতায় আমরাই একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বিজ্ঞানীরা এখন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরবর্তী গ্রহগুলোতে অক্সিজেন বা প্রাণের সংকেত খুঁজছেন।
তবে তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত পৃথিবী কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেনি। একে বলা হয় ফার্মি প্যারাডক্স, অর্থাৎ মহাবিশ্ব যদি এতই বিশাল এবং পুরনো হয়, তবে অন্য কেউ কেন এখনো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারল না? অনেক বিজ্ঞানীর মতে, বিশাল দূরত্ব কিংবা উন্নত সভ্যতার আত্মবিনাশী স্বভাব এর কারণ হতে পারে। তবুও ৫ হাজারেরও বেশি বহির্গ্রহ আবিষ্কারের পর নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থাগুলো এখন মঙ্গল গ্রহ কিংবা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপাতে অন্তত অণুজীব পর্যায়ের প্রাণের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।
এলিয়েন বা ইউএফও নিয়ে মানুষের আগ্রহ কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা জনপ্রিয় সংস্কৃতি বা পপ কালচারে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ১৯৪৭ সালে কেনেথ আর্নল্ডের ‘ফ্লাইং সসার’ দেখার বর্ণনা সংবাদমাধ্যমে আসার পর থেকেই সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ও উপন্যাসের জোয়ার আসে। স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইটি’ বা ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’ যেখানে এলিয়েনদের বন্ধুসুলভ হিসেবে দেখিয়েছে, সেখানে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ বা ‘এলিয়েন’ সিরিজে তাদের দেখানো হয়েছে ভয়ংকর আক্রমণকারী হিসেবে। এই কাল্পনিক চরিত্রগুলো মানুষের মনে এলিয়েন সম্পর্কে এক রহস্যময় ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।
আমেরিকার নেভাডায় অবস্থিত অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক ঘাঁটি ‘এরিয়া ৫১’ এলিয়েন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, রসওয়েলে উদ্ধার হওয়া এলিয়েন প্রযুক্তি এই ঘাঁটিতে বসেই গবেষণা করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে সিআইএ এই ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করলেও সেখানে ঠিক কী ধরণের পরীক্ষা চালানো হয় তা এখনো রহস্যে মোড়া। এছাড়াও যুক্তরাজ্যের রেন্ডলশাম ফরেস্ট কিংবা অ্যারিজোনার ফিনিক্স লাইটসের মতো ঘটনাগুলো বছরের পর বছর ধরে পর্যটক ও গবেষকদের আকৃষ্ট করে চলেছে, যারা বিশ্বাস করেন যে পৃথিবী পরিদর্শনে মাঝে মাঝেই ভিনগ্রহের অতিথিরা আসেন।
শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সাহসী পদক্ষেপ বৈজ্ঞানিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে অনেকে মনে করছেন এতে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়বে, অন্যদিকে তথ্য অধিকার কর্মীরা একে ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা হিসেবে দেখছেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















