ঢাকা ০১:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নাজমুলের পদত্যাগের দাবিতে অনড় ক্রিকেটাররা, মাঠে যাননি কেউ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে হামলা হতে পারে: রয়টার্স আওয়ামী লীগ ভুল স্বীকার করলে রিকনসিলিয়েশন সম্ভব: প্রধান উপদেষ্টা নাজমুল পদত্যাগ না করলে খেলা বর্জনের হুমকি ক্রিকেটারদের চাঁদাবাজি-মাস্তানি করলে এখনই বিএনপি থেকে বের হয়ে যান: আমীর খসরু আগামী সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের জন্য মার্কিন ভিসা কার্যক্রম স্থগিত একটি দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে: নজরুল ইসলাম খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় বিএনপি নেতা সাজুকে বহিষ্কার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে তরুণরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাবে: আলী রীয়াজ গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে বিজয়ী করতে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা ডাকসুর

একাত্তরের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ১৫ ডিসেম্বর

অাকাশ ইতিহাস ডেস্ক:

বিজয়ের মাস: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণের সূচনা।

১৪ ডিসেম্বরই বোঝা গিয়েছিল,পাকিস্তানি বাহিনীর মরণঘণ্টা বেজে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।সেদিন সন্ধ্যায় দক্ষিণ, পূর্ব, পূর্ব উত্তর ও উত্তর দিক থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মিলিত বাহিনী ঢাকা নগরীর উপকন্ঠে উপস্থিত হয়।

ঢাকা থেকে পিন্ডিতে বার্তা পাঠানোর সংখ্যা সেদিন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এই সব বার্তায় ফুটে উঠছিল চরম হতাশার সুর।সকাল ১০টায় প্রেরিত এক বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা আশ্বাসের ওপর বেঁচে আছি।… কিছু ঘটবে কি না অনুগ্রহ করে জানান, যা ঘটবার সেটা অতি দ্রুত হতে হবে।’ আরেক বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের কোনো মিসাইল নেই, আমরা কীভাবে গোলা নিক্ষেপ করব? কোনো বিমানবাহিনী নেই।বিমান হামলা হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ।’সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল, ‘আমরা সভা করতে যাচ্ছি গভর্নর হাউসে।’

এই খবর পেয়ে ভারতীয় যুদ্ধবিমান সরাসরি গোলা নিক্ষেপ করে গভর্নর হাউসের দরবার হল লক্ষ্য করে, আয়োজিত সভা পন্ড হয়ে যায় এবং ভয়ে কম্পমান এ এম মালিকের প্রাদেশিক সরকার সদলে পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় ‘নিরাপদ এলাকা’ ঘোষিত হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালে। আর তাই ১৫ ডিসেম্বর দিনটি শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিহীন পরিস্থিতিতে এবং বাতাসে পাওয়া যাচ্ছিল আত্মসমর্পণের আভাস।ভেতরের খবর অবশ্য সবার জানা ছিল না, আগের দিন বিকেলে গভর্নর ও নিয়াজির কাছে প্রেরিত বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জানান, ‘আপনি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যখন আর প্রতিরোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেটা কোনো কাজের কথাও হবে না।এখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সব রকম ব্যবস্থা আপনাদের নেওয়া উচিত।’ তবে সর্বশেষ এই বার্তাতেও আত্মসমর্পণ কথাটা ঊহ্য রাখা হয় এবং দায়দায়িত্ব চাপানো হয় ইস্টার্ন কম্যান্ডের ওপর।

অবরুদ্ধ ঢাকা হয়ে আছে থমথমে শহর, কী ঘটবে অচিরে, আত্মসমর্পণ না চূড়ান্ত যুদ্ধ, সেই ভাবনায় অধীর সবাই।লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে যাচ্ছে অনেক ঘটনা, নিথর হয়ে থাকা নিষ্ঠুর অনেক বাস্তবতা উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়। যেমন পড়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের ছড়ানো-ছিটানো লাশ, সেলিনা পারভীনের দুচোখ তখনো বাঁধা, বুকে বুলেটের, বেয়নেটের রক্তদাগ। নাগরিকজনেরা কেউ জানে না এসবের হদিস, জানে না সেনাসদরে চলছে কোন খেলা।

কী ঘটছিল পর্দার অন্তরালে, তার এক বিবরণ দিয়েছেন ঢাকাস্থ জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক কর্মকর্তা জন কেলি। মালিক তখন আর গভর্নর নন, প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন জাতিসংঘ-ঘোষিত নিরাপদ এলাকায়, প্রেসিডেন্টের বার্তা মোতাবেক যুদ্ধ বন্ধ করতে চান, কিন্তু নিয়াজির সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে গভর্নর সাহায্য চাইলে জন কেলি সেনাবাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল গফুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গফুর হোটেলে এসে গভর্নরের সঙ্গে নিয়াজির ফোনে কথা বলিয়ে দেন। সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মেজর জেনারেল ফারমান আলী গভর্নর এ এম মালিকের সঙ্গে মিলে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দাঁড় করিয়ে চলে যান ইস্টার্ন কম্যান্ডে।

অন্যদিকে ইস্টার্ন কম্যান্ডের হেডকোয়ার্টারসে জেনারেল নিয়াজি চাইছিলেন রাওয়ালপিন্ডি থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ আসুক আত্মসমর্পণের জন্য। সকালে তিনি গভর্নর মালিকের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলেন ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। গভর্নর লিখেছিলেন, ‘আপনার ও আমার কাছে প্রেসিডেন্ট প্রেরিত বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার দিক থেকে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেটা আমি জানতে চাইছি। বার্তায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আপনি সংঘাত বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পশ্চিম পাকিস্তানের ও এখানকার বিশ্বস্তজনদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যা দরকার সেটা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।’

অন্যদিকে জেনারেল মানেক শর আত্মসমর্পণের আহ্বান এবং আত্মসমর্পণ না করার পরিণতি বারবার ঘোষিত হতে থাকে।পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার তার আগেই পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিরপেক্ষ এলাকায় অবস্থান করতে শুরু করেছে।

ভারতীয় বিমান হামলায় আকাশপথের দখল হারিয়েছে পাকিস্তান। আক্রমণের তীব্রতায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালেকের পদত্যাগ ও হোটেল ইন্টারকনে (হোটেল শেরাটন) আশ্রয় নেয়ার রসালো বর্ণনা দিচ্ছেন বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি :

বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি

তারও আগে বিদেশি এক সাংবাদিক নিয়াজিকে প্রশ্ন করেন, ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকা থেকে দূরে রাখার মতো পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি কি আপনার আছে?তিনি বললেন, ‘ঢাকার পতন ঘটবে আমার মৃতদেহের ওপর দিয়ে।এর ওপর (বক্ষদেশ দেখিয়ে) দিয়ে তাহলে ওদের ট্যাংক চালিয়ে যেতে হবে।’(দ্রষ্টব্য: সিদ্দিক সালিকের উইটনেস টু সারেন্ডার)

পাকবাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজী

১৪ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে তিনটায় ইয়াহিয়া খানের টেলিগ্রাম আসে।বীরের মতো লড়াই করার জন্য নিয়াজি ও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রশংসা করে তিনি বলেন,যেহেতু আর প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় এবং চেষ্টা করেও কোনো লাভ নেই, যুদ্ধ বন্ধ করে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করো।’এই টেলিগ্রামকেই আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতি বিবেচনা করে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠান।জেনারেল মানেক শ নির্দেশ পাঠালেন,১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টার মধ্যে সদলবলে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি এদিন বেশ কয়েক দফা বার্তা পাঠিয়েছেন।প্রথম বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন,ভোর থেকেই তিনি কামানের গোলার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, বিশেষ করে ঢাকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গোলার শব্দ ক্রমেই বাড়ছে।ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমান লিফলেট ছড়াচ্ছে।তাতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ রয়েছে এবং আত্মসমর্পণকারীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।দ্বিতীয় বার্তায় উল্লেখ করেছেন, ঢাকায় ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ কমছে, বাংলাদেশের গেরিলারা ঢাকার বহিঃ প্রতিরক্ষাবৃত্ত আক্রমণ করে পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে।ঢাকা ও এর আশপাশে বিমান আক্রমণ তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ভারতীয় বিমান আক্রমণের মূল লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা এবং জেনারেল নিয়াজির সদর দপ্তর।প্রতিটি আক্রমণই সাফল্য বয়ে আনছে।বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, চার দিক থেকে ঢাকার ওপর চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।শিল্পাঞ্চল টঙ্গী হাতছাড়া হয়ে গেছে।আরও বহুসংখ্যক বেসামরিক কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে হোটেলের নিরপেক্ষ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।ভারতীয় নৌবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরের ছয় কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করছে।বন্দরে আগুন জ্বলছে।আকাশ বা নৌপথে আঘাত করার শক্তি পাকিস্তান পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে।বেসামরিক সরকারের আত্মসমর্পণের পর এখন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক কমান্ডার নিয়াজি।একসময় পাকিস্তান স্বীকার করে নিয়েছে, ভারতীয় বাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করেছে।

এখন কেবল ফাঁসির দড়ি টানার যতটুকু বাকি। আত্মসমর্পণ ছাড়া জীবন বাঁচানোর মতো আর কোনো পথ খোলা নেই।একটি প্রতীকী শুভেচ্ছা হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। গুটিকয় সন্দিগ্ধ মানুষ তখনো মনে করেছেন, আমেরিকার সপ্তম নৌবহর ‘পেয়ারে পাকিস্তানের হয়ে’ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে।আর উদ্বেলিত জনতার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে, তাদের জীবনে পাকিস্তানপর্বের দ্রুত সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা চলছেই। জয় বাংলা শ্লোগানে বাংলার মাটি, আকাশ, জলপথ দখলে তাদের।

জয় বাংলা শ্লোগান

১৫ ডিসেম্বরের মার্কিন দলিলপত্র। পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঠেকানো যাবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে এতে। সঙ্গে রয়েছে ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রশাসন কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ:

এভাবে পেরিয়ে যায় ১৫ ডিসেম্বরের দিন ও রাত, অমারাত্রির অবসান দৃষ্টিগোচর হলেও তা থেকে যায় দূরের হাতছানি হয়ে।নিষ্ঠুর পাকিস্তানি বাহিনী কীভাবে শেষ কামড় দেয়, আর কত রক্ত ঝরায় তা নিয়ে ছিল শঙ্কা। আশায় উদ্দীপ্ত দেশের মানুষ, তবু থেকে যায় আশঙ্কা, এভাবে কাটে আরও একটি দিন।

আর একটি দিন পরেই ১৬ই ডিসেম্বর,১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করেছিল মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী এবং আ্যলাএড ভারতীয় বাহিনীর কাছে।শত সহস্র শহীদের রক্তে রাঙানো এই স্বাধীনতা। আসুন আমরা সবাই আজ তাদের স্মরণ করি।এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবো না……..

স্বাধীনদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি সোচ্চার থাকুক সব সময়।ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই।একাত্তরের ঘাতক, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবার হতেই হবে ! যুদ্ধাপরাধীদের ‘ধর্মে’র নামে রাজনীতির মাঠ গরম করা আর চলবে না ! বাংলাদেশের মাঠিতে এদের সকল কর্ম-কান্ড বন্ধ করা হোক ।এমন সুযোগ হেলায় হারালে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবেনা ।অতএব এবার আমরা আর কোন ধানাই পানাই মানছিনা, মানবো না …সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই ।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

একাত্তরের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ১৫ ডিসেম্বর

আপডেট সময় ০৪:০২:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

অাকাশ ইতিহাস ডেস্ক:

বিজয়ের মাস: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণের সূচনা।

১৪ ডিসেম্বরই বোঝা গিয়েছিল,পাকিস্তানি বাহিনীর মরণঘণ্টা বেজে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।সেদিন সন্ধ্যায় দক্ষিণ, পূর্ব, পূর্ব উত্তর ও উত্তর দিক থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মিলিত বাহিনী ঢাকা নগরীর উপকন্ঠে উপস্থিত হয়।

ঢাকা থেকে পিন্ডিতে বার্তা পাঠানোর সংখ্যা সেদিন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এই সব বার্তায় ফুটে উঠছিল চরম হতাশার সুর।সকাল ১০টায় প্রেরিত এক বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা আশ্বাসের ওপর বেঁচে আছি।… কিছু ঘটবে কি না অনুগ্রহ করে জানান, যা ঘটবার সেটা অতি দ্রুত হতে হবে।’ আরেক বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের কোনো মিসাইল নেই, আমরা কীভাবে গোলা নিক্ষেপ করব? কোনো বিমানবাহিনী নেই।বিমান হামলা হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ।’সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল, ‘আমরা সভা করতে যাচ্ছি গভর্নর হাউসে।’

এই খবর পেয়ে ভারতীয় যুদ্ধবিমান সরাসরি গোলা নিক্ষেপ করে গভর্নর হাউসের দরবার হল লক্ষ্য করে, আয়োজিত সভা পন্ড হয়ে যায় এবং ভয়ে কম্পমান এ এম মালিকের প্রাদেশিক সরকার সদলে পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় ‘নিরাপদ এলাকা’ ঘোষিত হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালে। আর তাই ১৫ ডিসেম্বর দিনটি শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিহীন পরিস্থিতিতে এবং বাতাসে পাওয়া যাচ্ছিল আত্মসমর্পণের আভাস।ভেতরের খবর অবশ্য সবার জানা ছিল না, আগের দিন বিকেলে গভর্নর ও নিয়াজির কাছে প্রেরিত বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জানান, ‘আপনি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যখন আর প্রতিরোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেটা কোনো কাজের কথাও হবে না।এখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সব রকম ব্যবস্থা আপনাদের নেওয়া উচিত।’ তবে সর্বশেষ এই বার্তাতেও আত্মসমর্পণ কথাটা ঊহ্য রাখা হয় এবং দায়দায়িত্ব চাপানো হয় ইস্টার্ন কম্যান্ডের ওপর।

অবরুদ্ধ ঢাকা হয়ে আছে থমথমে শহর, কী ঘটবে অচিরে, আত্মসমর্পণ না চূড়ান্ত যুদ্ধ, সেই ভাবনায় অধীর সবাই।লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে যাচ্ছে অনেক ঘটনা, নিথর হয়ে থাকা নিষ্ঠুর অনেক বাস্তবতা উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়। যেমন পড়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের ছড়ানো-ছিটানো লাশ, সেলিনা পারভীনের দুচোখ তখনো বাঁধা, বুকে বুলেটের, বেয়নেটের রক্তদাগ। নাগরিকজনেরা কেউ জানে না এসবের হদিস, জানে না সেনাসদরে চলছে কোন খেলা।

কী ঘটছিল পর্দার অন্তরালে, তার এক বিবরণ দিয়েছেন ঢাকাস্থ জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক কর্মকর্তা জন কেলি। মালিক তখন আর গভর্নর নন, প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন জাতিসংঘ-ঘোষিত নিরাপদ এলাকায়, প্রেসিডেন্টের বার্তা মোতাবেক যুদ্ধ বন্ধ করতে চান, কিন্তু নিয়াজির সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে গভর্নর সাহায্য চাইলে জন কেলি সেনাবাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল গফুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গফুর হোটেলে এসে গভর্নরের সঙ্গে নিয়াজির ফোনে কথা বলিয়ে দেন। সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মেজর জেনারেল ফারমান আলী গভর্নর এ এম মালিকের সঙ্গে মিলে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দাঁড় করিয়ে চলে যান ইস্টার্ন কম্যান্ডে।

অন্যদিকে ইস্টার্ন কম্যান্ডের হেডকোয়ার্টারসে জেনারেল নিয়াজি চাইছিলেন রাওয়ালপিন্ডি থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ আসুক আত্মসমর্পণের জন্য। সকালে তিনি গভর্নর মালিকের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলেন ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। গভর্নর লিখেছিলেন, ‘আপনার ও আমার কাছে প্রেসিডেন্ট প্রেরিত বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার দিক থেকে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেটা আমি জানতে চাইছি। বার্তায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আপনি সংঘাত বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পশ্চিম পাকিস্তানের ও এখানকার বিশ্বস্তজনদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যা দরকার সেটা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।’

অন্যদিকে জেনারেল মানেক শর আত্মসমর্পণের আহ্বান এবং আত্মসমর্পণ না করার পরিণতি বারবার ঘোষিত হতে থাকে।পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার তার আগেই পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিরপেক্ষ এলাকায় অবস্থান করতে শুরু করেছে।

ভারতীয় বিমান হামলায় আকাশপথের দখল হারিয়েছে পাকিস্তান। আক্রমণের তীব্রতায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালেকের পদত্যাগ ও হোটেল ইন্টারকনে (হোটেল শেরাটন) আশ্রয় নেয়ার রসালো বর্ণনা দিচ্ছেন বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি :

বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি

তারও আগে বিদেশি এক সাংবাদিক নিয়াজিকে প্রশ্ন করেন, ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকা থেকে দূরে রাখার মতো পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি কি আপনার আছে?তিনি বললেন, ‘ঢাকার পতন ঘটবে আমার মৃতদেহের ওপর দিয়ে।এর ওপর (বক্ষদেশ দেখিয়ে) দিয়ে তাহলে ওদের ট্যাংক চালিয়ে যেতে হবে।’(দ্রষ্টব্য: সিদ্দিক সালিকের উইটনেস টু সারেন্ডার)

পাকবাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজী

১৪ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে তিনটায় ইয়াহিয়া খানের টেলিগ্রাম আসে।বীরের মতো লড়াই করার জন্য নিয়াজি ও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রশংসা করে তিনি বলেন,যেহেতু আর প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় এবং চেষ্টা করেও কোনো লাভ নেই, যুদ্ধ বন্ধ করে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করো।’এই টেলিগ্রামকেই আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতি বিবেচনা করে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠান।জেনারেল মানেক শ নির্দেশ পাঠালেন,১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টার মধ্যে সদলবলে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি এদিন বেশ কয়েক দফা বার্তা পাঠিয়েছেন।প্রথম বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন,ভোর থেকেই তিনি কামানের গোলার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, বিশেষ করে ঢাকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গোলার শব্দ ক্রমেই বাড়ছে।ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমান লিফলেট ছড়াচ্ছে।তাতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ রয়েছে এবং আত্মসমর্পণকারীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।দ্বিতীয় বার্তায় উল্লেখ করেছেন, ঢাকায় ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ কমছে, বাংলাদেশের গেরিলারা ঢাকার বহিঃ প্রতিরক্ষাবৃত্ত আক্রমণ করে পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে।ঢাকা ও এর আশপাশে বিমান আক্রমণ তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ভারতীয় বিমান আক্রমণের মূল লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা এবং জেনারেল নিয়াজির সদর দপ্তর।প্রতিটি আক্রমণই সাফল্য বয়ে আনছে।বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, চার দিক থেকে ঢাকার ওপর চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।শিল্পাঞ্চল টঙ্গী হাতছাড়া হয়ে গেছে।আরও বহুসংখ্যক বেসামরিক কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে হোটেলের নিরপেক্ষ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।ভারতীয় নৌবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরের ছয় কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করছে।বন্দরে আগুন জ্বলছে।আকাশ বা নৌপথে আঘাত করার শক্তি পাকিস্তান পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে।বেসামরিক সরকারের আত্মসমর্পণের পর এখন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক কমান্ডার নিয়াজি।একসময় পাকিস্তান স্বীকার করে নিয়েছে, ভারতীয় বাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করেছে।

এখন কেবল ফাঁসির দড়ি টানার যতটুকু বাকি। আত্মসমর্পণ ছাড়া জীবন বাঁচানোর মতো আর কোনো পথ খোলা নেই।একটি প্রতীকী শুভেচ্ছা হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। গুটিকয় সন্দিগ্ধ মানুষ তখনো মনে করেছেন, আমেরিকার সপ্তম নৌবহর ‘পেয়ারে পাকিস্তানের হয়ে’ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে।আর উদ্বেলিত জনতার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে, তাদের জীবনে পাকিস্তানপর্বের দ্রুত সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা চলছেই। জয় বাংলা শ্লোগানে বাংলার মাটি, আকাশ, জলপথ দখলে তাদের।

জয় বাংলা শ্লোগান

১৫ ডিসেম্বরের মার্কিন দলিলপত্র। পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঠেকানো যাবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে এতে। সঙ্গে রয়েছে ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রশাসন কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ:

এভাবে পেরিয়ে যায় ১৫ ডিসেম্বরের দিন ও রাত, অমারাত্রির অবসান দৃষ্টিগোচর হলেও তা থেকে যায় দূরের হাতছানি হয়ে।নিষ্ঠুর পাকিস্তানি বাহিনী কীভাবে শেষ কামড় দেয়, আর কত রক্ত ঝরায় তা নিয়ে ছিল শঙ্কা। আশায় উদ্দীপ্ত দেশের মানুষ, তবু থেকে যায় আশঙ্কা, এভাবে কাটে আরও একটি দিন।

আর একটি দিন পরেই ১৬ই ডিসেম্বর,১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করেছিল মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী এবং আ্যলাএড ভারতীয় বাহিনীর কাছে।শত সহস্র শহীদের রক্তে রাঙানো এই স্বাধীনতা। আসুন আমরা সবাই আজ তাদের স্মরণ করি।এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবো না……..

স্বাধীনদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি সোচ্চার থাকুক সব সময়।ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই।একাত্তরের ঘাতক, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবার হতেই হবে ! যুদ্ধাপরাধীদের ‘ধর্মে’র নামে রাজনীতির মাঠ গরম করা আর চলবে না ! বাংলাদেশের মাঠিতে এদের সকল কর্ম-কান্ড বন্ধ করা হোক ।এমন সুযোগ হেলায় হারালে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবেনা ।অতএব এবার আমরা আর কোন ধানাই পানাই মানছিনা, মানবো না …সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই ।