মঙ্গলবার মহানবমী পালনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের চূড়ান্ত পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্তরা ভিড় করেন দেবী দুর্গার চরণে অঞ্জলি ও ভোগ অর্পণের জন্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের এই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। শাস্ত্রীয় মতে, এই নবমী তিথিতে রাজা শ্রী রামচন্দ্র রাবণ বধের পর পূজা করেছিলেন। নবমী বিহিত পূজায় নীলকণ্ঠ ফুল ও ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়। দিনভর উৎসবের আমেজ থাকলেও সন্ধ্যায় দেবী বিদায়ের সুর বেজে ওঠে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, এবার নৌকায় চড়ে স্বামীগৃহে ফিরবেন দেবী দুর্গা, আর এই বিদায়ের বার্তাটি শস্য সমৃদ্ধিরও প্রতীক। উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিন পাড় হলেও সন্ধ্যায় ছিল বিদায়ের সুর। দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুর মর্দিনীর আরাধনা শেষ হলে কৈলাসে ফুল, ফসল তথা শষ্য সমৃদ্ধির বার্তা দিয়ে নৌকায় চড়ে স্বামীগৃহে ফিরবেন দেবী দুর্গা। ফলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিপুল উৎসাহে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরেছেন।
আগামী বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য এদিন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে একটি বিশেষ শোভাযাত্রা বের করা হবে, যা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সদরঘাটে গিয়ে শেষ হবে। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ছয় দিনের এই বর্ণিল উৎসবের পর্দা নামবে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমেই। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে বিদায় নেবেন তিনি। নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদ লাভ হয়। তাই শাপলা, শালুক ও বলিদানের মাধ্যমে দশভুজা দেবীর পূজা হয়েছে।
এবারের পূজায় সরকারি ছুটির মেয়াদ বাড়ানোয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বাড়তি আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিনদিন পর্যন্ত বর্ধিত করে। এর ফলে সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের সঙ্গে বাড়তি ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া গেছে।
পূজা উদযাপনের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গুলশান-বনানীসহ রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ নান্দনিক সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। এসব আয়োজনের নেপথ্যে দেশের স্বনামধন্য স্থপতি ও শিল্পীদের শৈল্পিক ছোঁয়া ছিল। গুলশান-বনানী মণ্ডপের স্থপতি প্রফেসর অমিতি কুণ্ডুর মতে, দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। এই নান্দনিক পরিবেশ দেখতে ভিন্ন ধর্মের মানুষেরও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
উৎসবের দিনগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার তিন বিভাগে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকেশ্বরীসহ বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শনকালে ‘উৎসব যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই মূলমন্ত্রে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনের আহ্বান জানান। এছাড়াও সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। উপভোগ করেছেন আবহমান বাংলার আবহে নির্মিত বৈচিত্র্যময় মণ্ডপ।
বিজয়া দশমীর আয়োজনে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে এবং জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ নিবন্ধ। এছাড়াও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েছে। উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছিল।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















