বঙ্গোপসাগরে চলাচলরত মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান নিশ্চিত করা, সামুদ্রিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সরকার স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে, যার আওতায় মহাকাশ থেকে সমুদ্রের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হবে। এই প্রকল্পে আনুমানিক ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় হতে পারে ৬০০ কোটি টাকার মতো।
প্রকল্পের আওতায় চারটি স্বল্প উচ্চতার স্যাটেলাইট, দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি স্থানীয় সার্ভার অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের ‘রিভিজিট টাইম’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় স্যাটেলাইটটি প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর পুনরায় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার মালিকানা পায়। এই বিশাল এলাকায় মৎস্য আহরণ ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিএসসিএল সূত্র জানায়, সংগৃহীত তথ্য দেশের অভ্যন্তরীণ সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে জাতীয় পর্যায়ে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং বিদেশি তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতা না কমে।
বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর প্রযুক্তিগত কাঠামো চূড়ান্ত করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নির্মাতা নিয়োগ দেওয়া হবে। সরকারের পরিকল্পনামতো কাজ এগিয়ে গেলে ২০২৮ সালের মধ্যেই এটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
এর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছিল, যা মূলত সম্প্রচার ও সিগন্যাল আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহৃত হয়। নতুন সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন। বর্তমানে নৌযান শনাক্তকরণে অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ব্যবহৃত হয়, যা মূলত উপকূলীয় রেডিও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। নতুন স্যাটেলাইটভিত্তিক এআইএস ব্যবস্থা চালু হলে উপকূল থেকে অনেক দূরের নৌযানের সংকেতও গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের দিকেও নজর দিচ্ছে বিএসসিএল। সংস্থাটির হিসাবে, সমুদ্রপথে নৌযানের চলাচল পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জেলেদের যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত হবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হবে। তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, একটি নৌকা প্রতি যাত্রায় ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সাশ্রয় করতে পারবে, যা বছরে মোট ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি সাশ্রয়ের সমতুল্য। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৫৯ কোটি টাকা। ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ অ্যাকটিভিটি বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকার ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। নৌযানের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও চেকপোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা গেলে আইন বাস্তবায়ন ও নজরদারিতে সুবিধা হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি হিসাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত ক্ষুদ্র বা আর্টিসানাল মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তবে নিবন্ধনের বাইরে আরও অন্তত ৭০ হাজার নৌকা সাগরে চলাচল করে। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এই অনিবন্ধিত নৌযানগুলোকেও সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান, এটি আইন প্রয়োগে এবং জেলেদের নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক হবে, কারণ বর্তমানে অনেক জেলে আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। ফলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কত ধরনের নৌযান শনাক্ত করা যাবে এবং নজরদারির জন্য অন্য কোনো প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যভিত্তিক লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ‘ফিশসেফ’ ২০২৫ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৩৫০ জন জেলের মৃত্যু হয়। এছাড়া দিকনির্ণয়ের যন্ত্র না থাকায় অনেক সময় জেলেরা ঝড়ের কবলে পড়ে বা ঢেউয়ের তোড়ে ভিনদেশের জলসীমায় চলে যান। আবার ঝড়ের কবলে পড়লে তাঁরা দিকহারা হয়ে ভেসে যান ভিনদেশে।
প্রযুক্তিবিদদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের কারিগরি দিক বিশ্লেষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান বলেন, প্রচলিত এআইএস সংকেত অনেক সময় জেলেরা বন্ধ রাখেন বা যন্ত্রটি নৌকায় থাকে না। তাই কেবল এআইএসের ওপর নির্ভর না করে সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডারের (এসএআর) মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমে যেসব নৌযান সংকেত পাঠায় না, তাদেরও শনাক্ত করা যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চারটি স্যাটেলাইট দিয়ে পুরো এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি সম্ভব কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা নেওয়া সাশ্রয়ী হবে কি না, তাও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় বিশ্লেষণ করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















