রাজধানীর কেন্দ্রে বসে শনিবার সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা দিতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় তা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রার্থীরা কেন্দ্রে গিয়ে এ খবর জানতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অনতিবিলম্বে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ঘটনাটির অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে প্রশ্ন ফাঁসের এই ঘটনা দেশের সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এ ঘটনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা সড়কে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমরা মনে করি, এটি সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে এই পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। এর অর্থ দাঁড়ায়, একটি পদের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৩১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দেশের দূরদূরান্ত অঞ্চল থেকে আসা প্রার্থীদের জন্য ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়া কেবল সময়সাপেক্ষই নয়, বরং চরম ব্যয়বহুলও বটে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা এখন বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে লাখ লাখ চাকরির প্রার্থীকে কেন ঢাকায় এসে পরীক্ষা দিতে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা আয়োজনের ব্যবস্থা করা হলে প্রার্থীদের ভোগান্তি ও খরচের পাশাপাশি রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপও অনেকাংশে কমবে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় যাতায়াত ও থাকার খরচের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির প্রস্তুতিও হোঁচট খেল। সব চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকাতেই হতে হবে, সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ থমকে থাকায় নতুন চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। শ্রমবাজারের চাহিদার কথা না ভেবে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটায় শিক্ষিত তরুণদের উপযুক্ত কাজ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর সেপ্টেম্বর সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই বেকার। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা প্রহর গোনেন। তবে প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা তাদের সেই বিশ্বাস ও স্বপ্নে বড় আঘাত হানে। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বাড়ছে না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটেছিল সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে। ছাত্র-জনতার এত বড় ত্যাগের পরও নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অসাধু চর্চা বহাল থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এই ঘটনার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। তাই নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের মুখোমুখি করা জরুরি। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় এনে তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরো সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করতে যথেষ্ট। স্থগিত পরীক্ষা পুনরায় সুষ্ঠুভাবে গ্রহণের পাশাপাশি প্রশ্ন ফাঁসের উৎসগুলো বন্ধে কঠোর ও স্থায়ী নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যেন প্রার্থীরা সমান অধিকার পান, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

















