ঢাকা ১২:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অক্টোবরেই চালু হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশে ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২

ভাই-কালচার ও চাঁদাবাজির চক্রে জিম্মি জনজীবন

বর্তমান সময়ে ‘অমুক ভাই’ বা ‘তমুক ভাই’য়ের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এক ধরনের মহামারিতে রূপ নিয়েছে। এলাকার পরিচিত মাস্তান বা প্রভাবশালীরা নিজেদের এই ‘ভাই’ পরিচয়ে আড়াল করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, কোনো পেশার কথা জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট জবাব আসে—’কিছু করি না, অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি।’ এই উত্তরের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক আতঙ্কিত বাস্তবতা। সবাই জানেন এই ‘ভাই’রা আসলে কী করেন; তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন। ব্যবসায়ীদের সম্মানী দিতে বাধ্য করা, এমনকি ব্যাংক ম্যানেজারদের শাসিয়ে ঋণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার মতো ঘটনাও নিত্যদিনের চিত্র।

রাজনৈতিক মদত ছাড়া এমন চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সচল রাখা অসম্ভব। রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে ফুটপাথের ছোট ব্যবসায়ী—সবাইকে একাধিক গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে অস্ত্র ও মাদকের ব্যবহার বাড়িয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কিশোর গ্যাং। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে যান চলাচলের নিয়ন্ত্রন পর্যন্ত—সবই এই ‘ভাই’দের কব্জায়। রাজশাহীর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। হালে জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির ভয়াবহ অভিযোগ উঠছে, এমনকি ঢাকায় একজন আইনপ্রণেতাকে এই কারণে সরিয়েও দেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অস্থির হয়ে পড়েছেন। তারা মাসোহারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং নিম্নমানের মালামাল নিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলার শিকার হচ্ছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। স্থানীয় প্রশাসন প্রায়শই এই প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তাকে বদলি বা ওএসডি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হয়। টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র; কোনো কাজ প্রকাশের পরপরই একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতাদের বাসায়ও নিয়মিত এই চাঁদার ভাগ পৌঁছায় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যবস্থার ফলে সরকার পাল্টালেও চাঁদাবাজির ধরনে নতুন রূপ আসে মাত্র, কিন্তু সাধারণ মানুষ জিম্মিই থেকে যায়। কবরের মাটি কিনতে গেলেও এখন ‘ভাই’য়ের অনুমতি বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ছে।

দেশের বাইরে থেকেও অনেক চাঁদাবাজ গ্রুপ তাদের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। এ প্রসঙ্গে এক পুলিশ কর্মকর্তা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আপনারা সবসময় আমাদের দোষারোপ করেন যে আমরা দেখেও দেখি না। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা আপনারা জানেন না। প্রমোশন ও পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অজানা নয়। একজন কর্মকর্তা যখন মোটা অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করে কোনো এলাকায় দায়িত্ব পান, তখন সেই বিনিয়োগ ওঠাতে তাকেও চাঁদাবাজদের সঙ্গে আপস করতে হয়।’ স্থানীয় পর্যায়ের যেকোনো সরকারি নিয়োগেও এই ‘ভাই’দের ইশারা ছাড়া কিছুই হয় না। এমনকি বিদেশগামী সাধারণ মানুষও ছাড়পত্র পেতে মোটা অংকের টাকা দিতে বাধ্য হন।

কমিশন বাণিজ্যের ধরনও আধুনিক হয়েছে। আগে এই টাকা বিদেশে পাচার হলেও বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন চলছে, যেখানে ঝুঁকি কম এবং অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন পড়ে না। ছিনতাই ও রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে। এই চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আটক বলিউড অভিনেতা ইমরান খান

ভাই-কালচার ও চাঁদাবাজির চক্রে জিম্মি জনজীবন

আপডেট সময় ১০:৪১:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

বর্তমান সময়ে ‘অমুক ভাই’ বা ‘তমুক ভাই’য়ের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এক ধরনের মহামারিতে রূপ নিয়েছে। এলাকার পরিচিত মাস্তান বা প্রভাবশালীরা নিজেদের এই ‘ভাই’ পরিচয়ে আড়াল করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, কোনো পেশার কথা জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট জবাব আসে—’কিছু করি না, অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি।’ এই উত্তরের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক আতঙ্কিত বাস্তবতা। সবাই জানেন এই ‘ভাই’রা আসলে কী করেন; তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন। ব্যবসায়ীদের সম্মানী দিতে বাধ্য করা, এমনকি ব্যাংক ম্যানেজারদের শাসিয়ে ঋণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার মতো ঘটনাও নিত্যদিনের চিত্র।

রাজনৈতিক মদত ছাড়া এমন চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সচল রাখা অসম্ভব। রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে ফুটপাথের ছোট ব্যবসায়ী—সবাইকে একাধিক গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে অস্ত্র ও মাদকের ব্যবহার বাড়িয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কিশোর গ্যাং। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে যান চলাচলের নিয়ন্ত্রন পর্যন্ত—সবই এই ‘ভাই’দের কব্জায়। রাজশাহীর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। হালে জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির ভয়াবহ অভিযোগ উঠছে, এমনকি ঢাকায় একজন আইনপ্রণেতাকে এই কারণে সরিয়েও দেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অস্থির হয়ে পড়েছেন। তারা মাসোহারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং নিম্নমানের মালামাল নিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলার শিকার হচ্ছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। স্থানীয় প্রশাসন প্রায়শই এই প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তাকে বদলি বা ওএসডি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হয়। টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র; কোনো কাজ প্রকাশের পরপরই একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতাদের বাসায়ও নিয়মিত এই চাঁদার ভাগ পৌঁছায় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যবস্থার ফলে সরকার পাল্টালেও চাঁদাবাজির ধরনে নতুন রূপ আসে মাত্র, কিন্তু সাধারণ মানুষ জিম্মিই থেকে যায়। কবরের মাটি কিনতে গেলেও এখন ‘ভাই’য়ের অনুমতি বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ছে।

দেশের বাইরে থেকেও অনেক চাঁদাবাজ গ্রুপ তাদের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। এ প্রসঙ্গে এক পুলিশ কর্মকর্তা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আপনারা সবসময় আমাদের দোষারোপ করেন যে আমরা দেখেও দেখি না। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা আপনারা জানেন না। প্রমোশন ও পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অজানা নয়। একজন কর্মকর্তা যখন মোটা অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করে কোনো এলাকায় দায়িত্ব পান, তখন সেই বিনিয়োগ ওঠাতে তাকেও চাঁদাবাজদের সঙ্গে আপস করতে হয়।’ স্থানীয় পর্যায়ের যেকোনো সরকারি নিয়োগেও এই ‘ভাই’দের ইশারা ছাড়া কিছুই হয় না। এমনকি বিদেশগামী সাধারণ মানুষও ছাড়পত্র পেতে মোটা অংকের টাকা দিতে বাধ্য হন।

কমিশন বাণিজ্যের ধরনও আধুনিক হয়েছে। আগে এই টাকা বিদেশে পাচার হলেও বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন চলছে, যেখানে ঝুঁকি কম এবং অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন পড়ে না। ছিনতাই ও রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে। এই চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।