ঢাকা ০৯:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইরান কখনোই শত্রুর সামনে মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান মব কালচার বন্ধে আইন সংশোধন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিএনসিসিতে ‘সুরে সুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৃহত্তর পরিকল্পনা আছে : মাহদী আমিন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন : নজরুল ইসলাম খান নেতানিয়াহুর পদত্যাগ ও লেবাননে হামলা বন্ধের দাবিতে উত্তাল ইসরাইল কাতার-কুয়েত-আমিরাতে ড্রোন হামলা চলতি মাসে ৯ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৩ কোটি ডলার পরিবারে মা একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান: মির্জা ফখরুল হামে মৃত্যু: ৩৫২ শিশুর প্রতি পরিবারকে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রিট

বহুবিবাহ, প্রাচীন ইতিহাস থেকে যেভাবে শরিয়তের নিয়ন্ত্রণে

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা নানা রূপে বিকশিত হয়েছে। বহুবিবাহ বিশেষত একাধিক স্ত্রী গ্রহণ এই দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনেরই একটি ধারা।

এটি কোনো একক ধর্ম বা সভ্যতার সৃষ্টি নয়, বরং প্রাচীন পৃথিবীর বহু সমাজে স্বীকৃত একটি বাস্তবতা, যার শিকড় পৌঁছে যায় হাজার হাজার বছর আগে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ইতিহাসে দেখা যায়, শাসক, গোত্রপ্রধান ও ক্ষমতাবানদের মধ্যে বহুবিবাহ ছিল সাধারণ একটি রীতি।

ব্যাবিলনের আইনসংগ্রহেও এর স্বীকৃতি ছিল। ইহুদি ঐতিহ্যেও বহু নবী ও শাসকের একাধিক স্ত্রীর উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বহুবিবাহ মানবসমাজে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত একটি সামাজিক কাঠামো।

আরব উপদ্বীপে ইসলাম আগমনের পূর্বে এই প্রথা ছিল সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। কেউ কেউ অসংখ্য স্ত্রী গ্রহণ করতেন, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ইসলাম এসে এটিকে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারের শর্ত আরোপ করে।

কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা তোমাদের পছন্দমতো নারী থেকে দুই, তিন বা চার পর্যন্ত বিবাহ করো, কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকো। (সুরা নিসা)

এই আয়াত বহুবিবাহকে সর্বোচ্চ চার জনে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করে।

 প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) উল্লেখ করেন, শরিয়তের বিধান মানুষের প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিলেও তা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত।

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, একাধিক বিবাহ বৈধ হলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য একটিই উত্তম, যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়।

ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) যখন ফাতিমা রা. জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন নবীজি (সা.) এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এতে বোঝা যায় বৈধতা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক ন্যায় ও মানসিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বাস্তবতায় বহুবিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিধবা নারী ও এতিমদের সুরক্ষা দেওয়া। তবে ইসলাম এটিকে কোনো বাধ্যতামূলক বা বিশেষ মর্যাদার কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি।

ইতিহাসে বহু আলেম আছেন, যারা বিবাহই করেননি যেমন ইমাম নববী (রহ.) , ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) , ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) , বিশর আল-হাফি (রহ.)। এতে প্রমাণিত হয় ধর্মীয় মর্যাদা নির্ভর করে জ্ঞান ও তাকওয়ার ওপর, বিবাহের সংখ্যার ওপর নয়।

অতএব, বহুবিবাহ একটি প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থা, এটি পূর্ব থেকেই চলে আসছে, যেটিকে ইসলাম এসে সীমিত, শর্তযুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

তথ্যসূত্র: সূরা নিসা ৩, সহিহ বুখারি হাদিস নং, ৩৭১৪, মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রহ., শরহ সহিহ মুসলিম, ইমাম নববী রহ., তারীখ আত-তাবারী, ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী রহ.

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান কখনোই শত্রুর সামনে মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান

বহুবিবাহ, প্রাচীন ইতিহাস থেকে যেভাবে শরিয়তের নিয়ন্ত্রণে

আপডেট সময় ০৮:০৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা নানা রূপে বিকশিত হয়েছে। বহুবিবাহ বিশেষত একাধিক স্ত্রী গ্রহণ এই দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনেরই একটি ধারা।

এটি কোনো একক ধর্ম বা সভ্যতার সৃষ্টি নয়, বরং প্রাচীন পৃথিবীর বহু সমাজে স্বীকৃত একটি বাস্তবতা, যার শিকড় পৌঁছে যায় হাজার হাজার বছর আগে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ইতিহাসে দেখা যায়, শাসক, গোত্রপ্রধান ও ক্ষমতাবানদের মধ্যে বহুবিবাহ ছিল সাধারণ একটি রীতি।

ব্যাবিলনের আইনসংগ্রহেও এর স্বীকৃতি ছিল। ইহুদি ঐতিহ্যেও বহু নবী ও শাসকের একাধিক স্ত্রীর উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বহুবিবাহ মানবসমাজে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত একটি সামাজিক কাঠামো।

আরব উপদ্বীপে ইসলাম আগমনের পূর্বে এই প্রথা ছিল সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। কেউ কেউ অসংখ্য স্ত্রী গ্রহণ করতেন, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ইসলাম এসে এটিকে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারের শর্ত আরোপ করে।

কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা তোমাদের পছন্দমতো নারী থেকে দুই, তিন বা চার পর্যন্ত বিবাহ করো, কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকো। (সুরা নিসা)

এই আয়াত বহুবিবাহকে সর্বোচ্চ চার জনে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করে।

 প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) উল্লেখ করেন, শরিয়তের বিধান মানুষের প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিলেও তা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত।

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, একাধিক বিবাহ বৈধ হলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য একটিই উত্তম, যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়।

ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) যখন ফাতিমা রা. জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন নবীজি (সা.) এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এতে বোঝা যায় বৈধতা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক ন্যায় ও মানসিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বাস্তবতায় বহুবিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিধবা নারী ও এতিমদের সুরক্ষা দেওয়া। তবে ইসলাম এটিকে কোনো বাধ্যতামূলক বা বিশেষ মর্যাদার কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি।

ইতিহাসে বহু আলেম আছেন, যারা বিবাহই করেননি যেমন ইমাম নববী (রহ.) , ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) , ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) , বিশর আল-হাফি (রহ.)। এতে প্রমাণিত হয় ধর্মীয় মর্যাদা নির্ভর করে জ্ঞান ও তাকওয়ার ওপর, বিবাহের সংখ্যার ওপর নয়।

অতএব, বহুবিবাহ একটি প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থা, এটি পূর্ব থেকেই চলে আসছে, যেটিকে ইসলাম এসে সীমিত, শর্তযুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

তথ্যসূত্র: সূরা নিসা ৩, সহিহ বুখারি হাদিস নং, ৩৭১৪, মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রহ., শরহ সহিহ মুসলিম, ইমাম নববী রহ., তারীখ আত-তাবারী, ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী রহ.

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর