ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৫ বছরের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারে পৌঁছাবে ফ্যামিলি কার্ড: প্রধানমন্ত্রী ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বিএনপির ইমেজ নষ্ট করতে একটা গ্রুপ উঠেপড়ে লেগেছে: চসিক মেয়র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের উপদেষ্টার পদায়ন চান জামায়াত আমির ঈদের ছুটিতে সীমিত পরিসরে ব্যাংক খোলা রাখা নিয়ে নতুন নির্দেশনা ঢাকায় ৪৭টি মাথার খুলি ও হাড়-কঙ্কালসহ গ্রেফতার ৪ হরমুজ প্রণালীতে তেল বন্ধ করলে ২০ গুণ শক্তিশালী হামলার হুমকি ট্রাম্পের পণ্যের দাম বাড়বে না, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে : বাণিজ্যমন্ত্রী জনগণকে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হবে না : প্রধানমন্ত্রী কারও অধীনে নয়, বাংলাদেশ চলবে নিজের ইচ্ছায়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

লাইফ কেয়ার হাসপাতালে আবার প্রসূতির মৃত্যু, বিক্ষোভ, ভাঙচুর

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

গাজীপুরের শ্রীপুর লাইফ কেয়ার হসপিটালে আবার এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে গতকাল সোমবার ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা হাসপাতালটিতে দফায় দফায় ব্যাপক ভাঙচুর চালান। স্থানীয় প্রশাসন এটি সিলগালা করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় অবস্থিত লাইফ কেয়ার হসপিটালে এর আগেও প্রসূতির মৃত্যুসহ চিকিৎসায় বিভিন্ন ভুলের অভিযোগ ছিল। অন্তত তিনবার ভ্রাম্যমাণ আদালত এটিকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেন। লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও রহস্যজনকভাবে এটি চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। গত ৫ বছরে বারবার এমন অভিযোগ ও প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও হাসপাতালটি কীভাবে চলছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যস্ততম মাওনা চৌরাস্তায় বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয় লাইফ কেয়ার হসপিটাল নামে ওই হাসপাতাল। গতকাল সকালে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রুমা আক্তার (২৫) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে– এমন অভিযোগে তিনতলার হাসপাতালটিতে দফায় দফায় ভাঙচুর চালান রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন দিনভর। এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত প্রসূতি রুমা আক্তার শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব এলাকার মানিক মিয়ার স্ত্রী এবং শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের হেরা পটকা গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে।

প্রসূতির স্বামী মানিক মিয়া বলেন, তাঁর স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে শনিবার রাত ২টার দিকে লাইফ কেয়ার হসপিটালে ভর্তি করা হয়। রোববার সকাল ১০টার দিকে অপারেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় রুমা আক্তারকে। দুপুর ১২টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর থেকেই প্রসূতি রুমাকে অপারেশন থিয়েটারে পর্যবেক্ষণে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তার কাছে কাউকে যেতে দিচ্ছিল না।

রুমা আক্তারের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, রোববার সন্ধ্যার পরই আমাদের সন্দেহ হয়। এভাবে আমরা রাত কাটাতে থাকি। এরই মধ্যে সোমবার ভোরে সাহরি খাওয়ার আগে রুমার অবস্থার অবনতি ঘটে বলে আমরা টের পাই। পরিস্থিতি খারাপ হলে এক পর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের না জানিয়ে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর উত্তরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঢাকা নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে খবর আসে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হন। হাসপাতালে মরদেহ ফিরিয়ে আনার আগেই বিক্ষুব্ধ লোকজন লাইফ কেয়ারে ভাঙচুর চালানো শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মরদেহ হাসপাতালে আনার পর দ্বিতীয় দফা ভাঙচুর চালানো হয়। এভাবে দফায় দফায় চলে ভাঙচুর। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসহ প্রতিটি তলার প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চলে। পরে বিক্ষুব্ধরা মাওনা-কালিয়াকৈর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। আধাঘণ্টা ধরে চলা বিক্ষোভে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

লাইফ কেয়ার হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজাহারুল ইসলাম পারভেজ বলেন, প্রসূতির স্বজনরা হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে হামলা করে ভাঙচুর করেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা যন্ত্রাংশ, চেয়ার, অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। এতে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় তারা ক্যাশে থাকা নগদ ২০ লাখ টাকা লুটে নেয়।

গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, ২০২২-২৩ সালের পর ওই হাসপাতালের লাইসেন্স আর নবায়ন করা হয়নি। ইতোমধ্যে এটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমানকে প্রধান করে এ কমিটি করা হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন, কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সর আবাসিক কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জন অফিসের একজন কর্মকর্তা।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, লাইফ কেয়ার হসপিটালে প্রসূতির সিজার হওয়ার পরে ফলোআপ করার জন্য ২৪ ঘণ্টা যে চিকিৎসক থাকার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি নবজাতকের অবস্থাও সংকটাপন্ন। আগে নবজাতকের দ্রুত চিকিৎসা করানোর জন্য তখন স্বজনদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, জানতে পেরেছি রাজশ্রী ভৌমিক নামে একজন সার্জন অপারেশনটি করেছেন। তবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরও পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম বলেন, সিজার করতে গিয়ে নবজাতকের মাথার বেশকিছু অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই ভালো একটা পরিবেশে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, আগেও লাইফ কেয়ার হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ হাসপাতালের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসক সংকটও রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

এরপরও কীভাবে চলছে হাসপাতালটি

লাইফ কেয়ার হসপিটালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসাসহ অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরোনো। একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও এটি দিব্যি কার্যক্র চালিয়ে যাচ্ছিল।

জানা যায়, লাইফ কেয়ারে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ইয়াসমিন আক্তার নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। অদক্ষ নার্সের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করানোয় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে তখন অভিযোগ ওঠে। একই বছর জানুয়ারি মাসে পারভীন আক্তার নামে এক নারীর শরীরে ভুল গ্রুপের রক্ত প্রবেশ করানোর অভিযোগ উঠে এ হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর এ হাসপাতালকে বিভিন্ন অপরাধে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন র‍্যাব-১ পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই বছর ১৩ মার্চ মোছা. শিমু নামে এক প্রসূতিকে ভুল চিকিৎসা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালে নার্সের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচারে ইয়াসমিন আক্তারের মৃত্যুর অভিযোগের পর ওই দিন লাইফ কেয়ার হাসপাতাল পরিদর্শন করেন তৎকালীন গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন মাহমুদা আক্তার। পরিদর্শন শেষে তিনি প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় লাইফ কেয়ার হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ওই মৃত্যুর ঘটনাতেও রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল ভাঙচুর করেন। পরে ২ এপ্রিল তদন্ত করে হাসপাতালটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেন সিভিল সার্জন। ২০২২ সালের ২৩ জুলাই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ওই হাসপাতালটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই হাসপাতালের নানা অসংগতির কারণে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এত অভিযোগ এবং তা প্রশাসনের জানা সত্ত্বেও হাসপাতালটি কীভাবে চলছে এ নিয়ে গতকাল স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো দুষ্টচক্রের যোগসাজশ রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নফল নামাজ আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম

লাইফ কেয়ার হাসপাতালে আবার প্রসূতির মৃত্যু, বিক্ষোভ, ভাঙচুর

আপডেট সময় ১০:০০:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

গাজীপুরের শ্রীপুর লাইফ কেয়ার হসপিটালে আবার এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে গতকাল সোমবার ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা হাসপাতালটিতে দফায় দফায় ব্যাপক ভাঙচুর চালান। স্থানীয় প্রশাসন এটি সিলগালা করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় অবস্থিত লাইফ কেয়ার হসপিটালে এর আগেও প্রসূতির মৃত্যুসহ চিকিৎসায় বিভিন্ন ভুলের অভিযোগ ছিল। অন্তত তিনবার ভ্রাম্যমাণ আদালত এটিকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেন। লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও রহস্যজনকভাবে এটি চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। গত ৫ বছরে বারবার এমন অভিযোগ ও প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও হাসপাতালটি কীভাবে চলছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যস্ততম মাওনা চৌরাস্তায় বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয় লাইফ কেয়ার হসপিটাল নামে ওই হাসপাতাল। গতকাল সকালে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রুমা আক্তার (২৫) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে– এমন অভিযোগে তিনতলার হাসপাতালটিতে দফায় দফায় ভাঙচুর চালান রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন দিনভর। এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত প্রসূতি রুমা আক্তার শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব এলাকার মানিক মিয়ার স্ত্রী এবং শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের হেরা পটকা গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে।

প্রসূতির স্বামী মানিক মিয়া বলেন, তাঁর স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে শনিবার রাত ২টার দিকে লাইফ কেয়ার হসপিটালে ভর্তি করা হয়। রোববার সকাল ১০টার দিকে অপারেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় রুমা আক্তারকে। দুপুর ১২টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর থেকেই প্রসূতি রুমাকে অপারেশন থিয়েটারে পর্যবেক্ষণে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তার কাছে কাউকে যেতে দিচ্ছিল না।

রুমা আক্তারের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, রোববার সন্ধ্যার পরই আমাদের সন্দেহ হয়। এভাবে আমরা রাত কাটাতে থাকি। এরই মধ্যে সোমবার ভোরে সাহরি খাওয়ার আগে রুমার অবস্থার অবনতি ঘটে বলে আমরা টের পাই। পরিস্থিতি খারাপ হলে এক পর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের না জানিয়ে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর উত্তরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঢাকা নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে খবর আসে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হন। হাসপাতালে মরদেহ ফিরিয়ে আনার আগেই বিক্ষুব্ধ লোকজন লাইফ কেয়ারে ভাঙচুর চালানো শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মরদেহ হাসপাতালে আনার পর দ্বিতীয় দফা ভাঙচুর চালানো হয়। এভাবে দফায় দফায় চলে ভাঙচুর। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসহ প্রতিটি তলার প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চলে। পরে বিক্ষুব্ধরা মাওনা-কালিয়াকৈর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। আধাঘণ্টা ধরে চলা বিক্ষোভে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

লাইফ কেয়ার হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজাহারুল ইসলাম পারভেজ বলেন, প্রসূতির স্বজনরা হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে হামলা করে ভাঙচুর করেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা যন্ত্রাংশ, চেয়ার, অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। এতে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় তারা ক্যাশে থাকা নগদ ২০ লাখ টাকা লুটে নেয়।

গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, ২০২২-২৩ সালের পর ওই হাসপাতালের লাইসেন্স আর নবায়ন করা হয়নি। ইতোমধ্যে এটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমানকে প্রধান করে এ কমিটি করা হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন, কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সর আবাসিক কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জন অফিসের একজন কর্মকর্তা।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, লাইফ কেয়ার হসপিটালে প্রসূতির সিজার হওয়ার পরে ফলোআপ করার জন্য ২৪ ঘণ্টা যে চিকিৎসক থাকার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি নবজাতকের অবস্থাও সংকটাপন্ন। আগে নবজাতকের দ্রুত চিকিৎসা করানোর জন্য তখন স্বজনদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, জানতে পেরেছি রাজশ্রী ভৌমিক নামে একজন সার্জন অপারেশনটি করেছেন। তবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরও পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম বলেন, সিজার করতে গিয়ে নবজাতকের মাথার বেশকিছু অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই ভালো একটা পরিবেশে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, আগেও লাইফ কেয়ার হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ হাসপাতালের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসক সংকটও রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

এরপরও কীভাবে চলছে হাসপাতালটি

লাইফ কেয়ার হসপিটালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসাসহ অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরোনো। একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও এটি দিব্যি কার্যক্র চালিয়ে যাচ্ছিল।

জানা যায়, লাইফ কেয়ারে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ইয়াসমিন আক্তার নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। অদক্ষ নার্সের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করানোয় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে তখন অভিযোগ ওঠে। একই বছর জানুয়ারি মাসে পারভীন আক্তার নামে এক নারীর শরীরে ভুল গ্রুপের রক্ত প্রবেশ করানোর অভিযোগ উঠে এ হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর এ হাসপাতালকে বিভিন্ন অপরাধে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন র‍্যাব-১ পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই বছর ১৩ মার্চ মোছা. শিমু নামে এক প্রসূতিকে ভুল চিকিৎসা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালে নার্সের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচারে ইয়াসমিন আক্তারের মৃত্যুর অভিযোগের পর ওই দিন লাইফ কেয়ার হাসপাতাল পরিদর্শন করেন তৎকালীন গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন মাহমুদা আক্তার। পরিদর্শন শেষে তিনি প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় লাইফ কেয়ার হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ওই মৃত্যুর ঘটনাতেও রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল ভাঙচুর করেন। পরে ২ এপ্রিল তদন্ত করে হাসপাতালটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেন সিভিল সার্জন। ২০২২ সালের ২৩ জুলাই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ওই হাসপাতালটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই হাসপাতালের নানা অসংগতির কারণে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এত অভিযোগ এবং তা প্রশাসনের জানা সত্ত্বেও হাসপাতালটি কীভাবে চলছে এ নিয়ে গতকাল স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো দুষ্টচক্রের যোগসাজশ রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।