আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অন্যান্য বিভাগের পাশাপাশি নিউরোসার্জারি বিভাগে রোগিদের চাপ সবসময় অনেক বেশি থাকে। সারা দেশ থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।
বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের আস্থার প্রতীক হচ্ছে ঢামক হাসপাতাল। সেই আস্থার প্রতীককে ব্যবহার করে ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু ব্যক্তি রোগী নিয়ে বাণিজ্য করেন।
এ কারণে ঢামেকে চিকিৎসার জন্য আসা লোকজনের স্বজনরা মনে করছেন, রোগিদের চিকিৎসার আগে ওয়ার্ডের দায়িত্বরতদের জরুরি চিকিৎসা দরকার। তারা আসলে মানসিক রোগী। না হলে মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে কখনোই তারা বাণিজ্য করতে পারতেন না। হাসপাতালে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাচ্ছি, ওই ব্যবস্থাপনাদের আগে চিকিৎসা দেন। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। রোগীরা স্বাচ্ছন্দে ওয়ার্ডে থাকতে পারবে।
শনিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের ২য় তলায় ২০৪ নম্বর ওয়ার্ড নিউরসার্জারি শিশু-মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় সেখানে মাত্রারিক্ত রোগী। কোথাও জায়গা নেই। বেড, বারান্দা, মেঝে সব জায়গায়ই রোগীতে ঠাসা। ফ্লোরে থাকা রোগীদের কারণে ওয়ার্ডে চলাচলের জায়গায় পর্যন্ত নেই। নেই কোনো শৃঙ্খলা। সেখানে গিয়ে দেখা যায় বয়স্ক মুমূর্ষু রোগীকে অক্সিজেন লাগিয়ে ফ্লোরে রাখা হয়েছে।
ওই ওয়ার্ডে রোগীতে গিজগিজ করলেও সেখানে দায়িত্ব নার্স, ওয়ার্ড বয় ও অন্যরা ডিউটি করলেও ডিউটিরত চিকিৎসক পেতে হলে, আগের নিয়ম অনুযায়ী নীচ তলায় যেতে হবে। একই ওয়ার্ডে ৫ ইউনিটের রোগী ভর্তি থাকে। একেকটা ইউনিটের ডাক্তার আলাদা।
ওয়ার্ডটিতে কয়েকজন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এই ওয়ার্ডে সমস্যার শেষ নেই। একজন বলেন, সমস্যার কথা বলব, আপনি নাম লিখে দিবেন। তারা কালকে আমাকে ওয়ার্ড থেকে রোগীসহ বের করে দেবে।
অপর এক রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করে জানান, এই ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। বিছানা পেতে গেলে টাকা, ওয়ার্ডের ভেতর ফ্লোরে জায়গা পেতে হলে টাকা, ক্যাথেটার লাগাতে গেলে টাকা। স্যালাইন বন্ধ ও চালু করার কাজেও টাকা লাগে।
টাকা দিলে ওয়ার্ডের ডিউটিতে থাকা লোকজন সুন্দরভাবে কাজ করে। আর যদি টাকা না দেই, তাহলে রোগীর ১২টা বেজে যাবে। সকালের কাজ করবে রাতে, আবার রাতের কাজ করবে পরের দিন বিকেলে। তাও আবার অমানুষিক আচরণ করে। তারা শুরুতেই আচরণ খারাপ করে বুঝিয়ে দেয় যে, আমাকে টাকা দাও, ভালো ব্যবহারের পাশাপাশি সেবাও পাবা ভালো।
তিনি আরও জানান, এখানে রোগীর অবস্থা আপনারা দেখছেন। লোকজন তার রোগী একটু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার জন্য একটা সিটের চেষ্টা কবরেই। রোগীর স্বজনদের এই সরলতার সুযোগ নিয়েই ওয়ার্ডে থাকা কিছু অসৎ লোকজন বাণিজ্য করে। কোন রোগীর আগে ছুটি হবে সেটা ওয়ার্ডের লোকজনই জানে। সে কারণে রোগীর স্বজনরা অগ্রিম তাদের হাতে টাকা দেয়। যে টাকা বেশি দেয় তাকে সিট দেওয়া হয়।
রোগীর এই স্বজন আরও বলেন, এছাড়া সরকার তো কোটি কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করছে আমাদের মতো অসহায় গরিবরা যেন স্বাচ্ছন্দের চিকিৎসা পায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও যথাসম্ভব চেষ্টা করছে রোগীদের সেবা যতটা সহজ করা যায়। কিন্তু ওয়ার্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা লোকজনের কারণেই আজকে রোগীরা অসহায়। আমি মনে করি তাদেরই জরুরি চিকিৎসা দরকার। আমার মনে হয় তারা মানসিক রোগী। তা না হলে রোগীদের বাণিজ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন না।
নিউরো সার্জারির ২০৪-এর ওয়ার্ড মাস্টার আবুল হোসেন এক বাক্যে এসব অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বলেন, টাকার বিনিময়ে রোগীদের বিছানা পাইয়ে দেওয়াসহ অন্যান্য কাজ আগের তুলনায় অনেক নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমরা সব সময় মনিটরিং করে থাকি। এছাড়া ওই ওয়ার্ডে প্রতিদিন বহু রোগী ভর্তি হয়। এক ওয়ার্ডে পাঁচটি ইউনিটের রোগী ভর্তি হয়। এ জন্য ওই ওয়ার্ডে প্রতিদিনই রোগীর ব্যাপক চাপ থাকে।
অপরদিকে নিউরোসার্জারির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা, অসিত চন্দ্র সরকার জানান, ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ ইউনিটের তত্ত্বাবধানে রোগী ভর্তি হয়। সেখানে প্রতিদিনই রোগী ভর্তি হয়। এ জন্য সব সময়ই রোগীর চাপ বেশি থাকে। ওয়ার্ডে কিছু অসাধু ব্যক্তি রোগীকে জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকে- বিষয়টি সত্য।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া ভর্তি রোগীকে ট্রলিতে করে হাসপাতালের অন্য কোথাও পরীক্ষার জন্য নিয়ে যেতেও টাকা দিতে হয়। রোগী বা তাদের স্বজনরা এজন্য টাকা না দিলে তারা কাজ করতে চায় না। এক কথায় তারা রোগীদের অসহায়েত্বের সুযোগ নেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাযথ চেষ্টা করছে এসব অনিয়ম বন্ধ করার জন্য।
এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক জানান, এরকম অভিযোগ আমাদের কানেও আসে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। আমরা কার বিরুদ্ধে ভ্যবস্থা নেব। প্রমাণসহ কেউ অভিযোগ দিলে, তার পরিচয় গোপন রেখে ওয়ার্ডে থাকা ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশনে যেতাম। তবুও আমরা সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছি হাসপাতালে রোগীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা পায়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















