আকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গেল বৃহস্পতিবারে শেষ হল রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মেলন। সম্মেলনে ট্রাম্প তার ভাষণে অন্তত ২৫টি মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছেন। যা উঠে এসেছে বিখ্যাত গণমাধ্যম দ্যা ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে। যার কিছু তুলে ধরা হলো।
ট্রাম্প: সমগ্র ইউরোপ ও ওয়েস্টার্ন হামশফেয়ার একত্রে যত কোভিড-১৯ নির্ণয়ের পরীক্ষা করেছে, আমেরিকা তার চাইতে অনেক বেশি পরীক্ষা করেছে। অন্য দেশের চাইতে আমরা প্রায় চার কোটি (৪০ মিলিয়ন) বেশি টেস্ট করেছি।
ওয়াশিংটর পোস্ট বলছে, তার এই দাবিটি বিভ্রান্তিকর। কারণ চীনের রাজধানী বেইজিং কর্তৃপক্ষ প্রায় নয় থেকে আট কোটি কোভিড নির্ণয়ের পরীক্ষা করিয়েছে। চীন ছাড়াও প্রতি লাখে করা কোভিড টেস্টের সংখ্যার হারে রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যর পেছনেই আছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের করোনা নির্ণয়ের পরীক্ষাটি ছিল সময়সাপেক্ষ। পরীক্ষার ফলাফলের বিলম্বের কারণে এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেয়েছে দেশটি। বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্প: “এই মহামারী মোকাবেলায় যখন আমি তড়িঘড়ি করে চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলাম তখন জো বাইডেন আমাকে অতিউৎসাহী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। যদি আমি তার কথায় কান দিয়ে ইউরোপের ওপরও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতাম তাহলে আরও লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি হওয়ার আশংকা ছিল”।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ডেমোক্রেট প্রার্থী বাইডেনের সমালোচনাকে সম্মেলনে অতিরঞ্জিত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
জানুয়ারির ৩১ তারিখ মি. ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ থেকে নন-আমেরিকান কেউ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে আমেরিকান নাগরিক এবং দেশটিতে স্থায়ী বসবাসকারীরা চীন থেকে দেশে আসতে পারবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে বিমানবন্দরে স্ক্যানিং প্রক্রিয়া ও ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে থাকতে হবে।
তার সিদ্ধান্তের আগে অথবা একই সময়ে গণমাধ্যমটির হিসাব মতে প্রায় ৩৮টা দেশ নিজেদের দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সাথে বিমান কর্তৃপক্ষগুলোও বিভিন্ন দেশে তাদের ফ্লাইট বাতিল করছিল।
যদিও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল এবং চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে যে অনেক মানুষের জীবন বেঁচেছে তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
চীনের রাষ্ট্রনায়ক শি জিং পিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো বলছে, ট্রাম্প ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপে অনিচ্ছুক ছিলেন। দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তিনি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার এই পদক্ষেপ নেন। হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের সেক্রেটারি এলেক্স এজার সাংবাদিকদের এক বিবৃতিতে গেল ফেব্রুয়ারির সাত তারিখে বলেছিলেন, “প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার যে সুপারিশ আমরা করেছিলাম সেটা ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে”।
ট্রাম্প বাইডেনের যে মন্তব্যের কথা সম্মেলনে বলেছেন সেটা আদৈা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ছিল না। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে সেই সময় বাইডেন বলেছেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অতি উৎসাহী হওয়ার সময় এটা নয়, তার উচিত ভীতি না ছড়িয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এই ভাইরাস দূর করতে কাজ করা”।
ট্রাম্প: বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকাতেই সবচেয়ে কম প্রাণহানি হয়েছে।
জন হপকিংস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০টি প্রভাবশালী দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থার ১১তম। প্রতি মিলিয়নে মৃত্যুর হারে দেশটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ।
যেহেতু ট্রাম্প ‘প্রভাবশালী’ দেশের কথা বলেছেন, সেহেতু ইকোনমিক কোঅপারেশন ও ডেভেলপমেন্ট সংস্থার সদস্য দেশগুলোর হিসেবে ধরলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুর সংখ্যা কম। তবে অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, লাটভিয়া, ইসরাঈল, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার ও আরও অনেক প্রভাবশালী দেশের চাইতে দেশটির মুত্যর সংখ্যা বেশি।
ট্রাম্প: প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের পর আমার মতো আর কোন প্রেসিডেন্ট এতো বেশি কাজ আফ্রিকান আমেরিকান সম্প্রদায়ের জন্য করেনি।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, তার এই দাবি হাস্যকর। করোনা ভাইরাস পূর্ববর্তী সময়ে তিনি আফ্রিকান আমেরিকানদের জন্য কিছু চাকরির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি কিছু ভালো পদক্ষেপ নেন। সেসবের ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্প এই দাবি করতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতাকালে লিংডন বি জনসন সিভিল রাইট অ্যাক্ট ১৯৬৪ এবং ভোটিং রাইট অ্যাক্ট ১৯৬৫ নামে দুটি আইন পাস করান। যা পরবর্তীতে মার্কিন মুল্লুকে আফ্রিকান আমেরিকানদের জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে। যদিও আইনগুলো পাস করানো এত সহজ ছিল না। প্রেসিডেন্ট জনসনকে এই আইন পাস করানোর জন্য মডারেট রিপাবলিকান ও লিবারেল ডেমোক্রেটের সাথে কোয়ালিশন করতে হয়েছিল।
এদিকে, ট্রাম্প এই ধরনের কাজ কোনদিন করতে চেষ্টাও করেননি। তাই তার দাবি নিছকই হাস্যকর।
ট্রাম্প: আমরা সবসময় এবং খুব ভালভাবে চেষ্টা করেছি রোগীদের সুরক্ষা দিতে। কারণ এটি আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল।
দাবিটিকে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ওয়াশিংটনপোস্ট। তারা বলছে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অ্যাফরডেবল (সহজলভ্য) কেয়ার অ্যাক্ট ও প্রিএগজিসটিং কভারেজ গ্যারান্টি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
সম্পূর্ণ আইনগুলো বাদ দেওয়ার জন্য তিনি সুপ্রিম কোর্টকে অনুরোধ করেছেন এবং এই আইনগুলোর বিপরীতে তিনি এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও জানাননি। যদিও তার এটি নির্বাচনী ইশতেহার ছিল।
ট্রাম্প: দেশের সেনাবাহিনীর জন্য আমরা প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করছি, আমি ক্ষমতায় আসার আগে যেটি খুব খারাপভাবে কমেছিল।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ‘ট্রাম্পের এই মিথ্যা কথাটি আমাদের গণমাধ্যমে ১৭৫ বারে এসেছে’।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে এই বাজেট কমার কারণ বৈদেশিক সেনা অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় সংকোচন নীতি। বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ হওয়ায় এই খাতে বাজেট আরও কমে যায়।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এত টাকা খরচের কথা বললেও আদতে পুরো অর্থ খরচ হয়নি। তাদের বাজেটের একটি ছোট্ট অংশ ব্যয় হয়েছে সেনা সরঞ্জাম কেনার খাতে।
ট্রাম্প: ‘করভেনশন চলাকালীন সময়ে ডেমোক্রেট পরিচালিত শহরে সংঘর্ষের ঘটনায় জো বাইডেন নীরব ছিলেন’।
গণমাধ্যমটি বলছে, উইসকিনসনের এই ঘটনায় বুধবার বাইডেন নিন্দা জানিয়ে টুইট করেছেন। টুইটে তিনি বলেন, ‘বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন ও যৌক্তিক। কিন্তু একটি সম্প্রদায়কে পুড়িয়ে দেওয়া বিক্ষোভ নয়। এটি প্রয়োজনহীন সংঘর্ষ এবং জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে’।
ট্রাম্পের মিথ্যার ফুলঝুড়ি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে এর আগেও বেশ কিছু প্রতিবেদন হয়েছে। নির্বাচনের দুমাস আগে নতুন করে ওয়াশিংটন পোস্টের এ প্রতিবেদন ট্রাম্পকে অসুবিধায় ফেলে কি না সেটা সময়ই বলে দেবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















