অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ভোটের ১০ দিন বাকি থাকলেও গাজীপুর আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠার দাবি করছেন বিরোধ মেটানোয় দায়িত্ব পাওয়া দুই সংসদ সদস্যের একজন। নানামুখি চেষ্টার পর গাজীপুর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রভাব বলয়ের নেতারা দলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারে নেমেছেন। তারপরও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে নানা কারণে।
গত ২৯ এপ্রিল ধানমন্ডিতে গাজীপুর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক বৈঠকে সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই সংসদ সদস্য আ ক ম মোজাম্মেল হক ও জাহিদ আহসান রাসেলকে বিরোধ মেটাতে দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই রাতেই দুই সংসদ সদস্য টঙ্গীতে গাজীপুরের নেতাদের নিয়ে আবার বৈঠকে বসেন। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। কোথায় সমস্যা, কেন দলের জয়ে একাট্টা হয়ে নামতে অসুবিধা, এসব নিয়ে জাহাঙ্গীরের বিরোধিতা করা নেতারা কথা বলেছেন মন খুলে। আর জাহাঙ্গীরের পক্ষের নেতারাও দিয়েছেন জবাব। আর এসব চেষ্টার সুফল দেখা গেছে। গত কিছুদিন ধরেই সব পক্ষকেই প্রকাশ্যে জাহাঙ্গীরের হয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে।
টঙ্গীর সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা মতো আমরা গাজীপুরের নেতাকর্মীদের বিভেদ মেটাতে সক্ষম হয়েছি। ইতোমধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।’
‘আচরণবিধি মেনে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা না করে আমার কর্মী-সমর্থকদের ভোট চাওয়ার জন্য ঘরে ঘরে পাঠাচ্ছি। প্রতিনিয়ত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছি।’
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও মহিলা লীগের সব বলয়ের নেতাকর্মীরাও নৌকার পক্ষে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ করছেন বলে দাবি করেছেন রাসেল।
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইলিয়াস আহমেদ, মহিউদ্দিন মহি, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রুহুল আমিন মনি সরকার, ছাত্রলীগ নেতা কাজী মঞ্জুর, রেজাউল করিম, মোশিউর রহমান সরকার বাবু, আব্দুর রহমান পিংকুকে দেখা যাচ্ছে ভোটের ময়দানে। এর আগে অভিযোগ ছিল আজমত বলয়ের একটি বড় অংশ জাহাঙ্গীরের পক্ষে নৌকার নির্বাচন করছেন না।
কাউন্সিলর নির্বাচনে ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে এমনটি করা হলেও গত কয়েকদিনে সেই চিত্র পাল্টেছে অনেকটা। আস্তে আস্তে নৌকার প্রচারণায় সরব হচ্ছেন আজমত বলয়ের কর্মী-সমর্থকরাও।
সংশয় কাটেনি গাজীপুরে
২০১৩ সালের প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানকে সে সময় বর্তমান প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বেকায়দায় ফেলেছিলেন বলে প্রচার আছে। আর এই নির্বাচনে জাহাঙ্গীর মনোনয়ন পাওয়ার পর আজমত এবং তার সমর্থকরা জাহাঙ্গীরকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছিলেন বলে ক্ষমতাসীন দলে তথ্য আছে। এ নিয়ে আজমতকে ফোন করে এক দফা সতর্ক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরে ডেকে নিয়েও কথা বলেন তিনি।
২৯ এপ্রিলের ওই বৈঠকের একটি ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশ হয়েছে, যেখানে ওবায়দুল কাদের সরাসরি বলছেন, বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ কাজ করছে বলে তার কাছে তথ্য আছে। জাহাঙ্গীর হারলে আগামী সংসদ নির্বাচনে কারও এমপি হওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন কাদের।
তবে গাজীপুরে সংশয় কেবল আজমত উল্লাহ খানকে নিয়ে নয়। বিশাল নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাব বলয় আছে। একেকটি বলয়ের নেতা-কর্মীদের চাওয়া পাওয়া এককে রকম। জাহাঙ্গীরকে কেউ পছন্দ করছিলেন, কেউ করছিলেন না। এসব নিয়েই মূলত চিন্তিত ছিল ক্ষমতাসীন দল।
গত ৩ মে জাহাঙ্গীর আলম প্রচার চালান নগরীর ৪৫, ৫৬ ও ৫৭ নং ওয়ার্ডে। এর মধ্যে ৫৭নং ওয়ার্ডে বসবাস করেন আজমত উল্লাহ খান। নিজ ওয়ার্ডে সেদিন দুপুরে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জাহাঙ্গীরের পাশে ছিলেন আজমতও। তবে কোনো পথসভায় বক্তব্য রাখেননি আজমত। এমনকি নেতাকর্মীদের মিছিল ঘিরে যখন জাহাঙ্গীর আলমের গাড়িবহর এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন পেছনের গাড়িতে বসে ছিলেন তিনি। এতে করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সমর্থকদের মাঝে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘বিরোধ মিটিয়ে দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছেন আজমত উল্লাহ খান। এটি দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছে। কিন্তু তিনি (আজমত) মন খুলে নেমেছেন কি না সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।’
ওইদিন নগরীর মধুমিতা এলাকায় পথসভায় মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আজমত ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের সুসংগঠিত প্রচারণার ফলে ঘরে ঘরে নৌকার রব উঠেছে। আগামী ১৫ মে গাজীপুরের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকার পক্ষে ব্যালট বিপ্লব ঘটাবে।’
টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদিন দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেলের নির্দেশনা পেয়ে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছে।’
সংসদ সদস্য রাসেল দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘বিগত সিটি নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভোটারদের শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশের চলমান অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নৌকাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন, আমরা গাজীপুরকে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলব। আগামী ১৫ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।’
আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে মিটলেও ভেতরে ভেতরে বিরোধিতা নিয়ে দলের সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও উল্টো চিত্র বিএনপিতে। দল এবং জোটের মধ্যে কোনো বিভেদের আভাস নেই। তারা ক্ষমতাসীন দলে ‘বিরোধের’ সুযোগ নেয়ার আশায়। আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই নগরে ২০১৩ সালে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম এ মান্নান জিতেছিলেন দেড় লাখ ভোটে। ওই নির্বাচনেও প্রকাশ্যে এবং গোপনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগের একাধিক পক্ষ।
আগামী ১৫ মের ভোটের দিকে কেবল গাজীপুর বা খুলনাবাসী নয়, দৃষ্টি থাকবে সারা দেশেরই। সেদিন দুই মহানগরে প্রায় ১৭ লাখ ভোটার রায় দেবেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ভোটকে দুই প্রধান দলের জনপ্রিয়তা প্রমাণের সুযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















