ঢাকা ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ নতুন দলের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে যারা ইরানের সামনে এখন কেবল দুই পথ—চুক্তি অথবা আত্মসমর্পণ: ট্রাম্প পাঁচ দফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি সরকার দমনে ব্যস্ত, দ্রব্যমূল্য-গ্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: গোলাম পরওয়ার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগদখলের সুযোগ, মন্ত্রিসভায় খসড়া পাশ শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে হুমায়ুন কবির রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘নতুন মাত্রা’ যোগ করেছেন তারেক রহমান: চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার

বদনজর কি সত্য? কারো বদনজর লেগেছে কিনা বুঝবেন কীভাবে?

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধানের অংশ। কখনো রোগ, কখনো আর্থিক সংকট, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ— আবার কখনো বদনজর (আল-আ’ইন)-এর মাধ্যমেও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করেন।

ইসলাম বদনজরকে কুসংস্কার বলে অস্বীকার করেনি; বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে এর বাস্তবতা স্বীকৃত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইসলাম শিক্ষা দেয়, সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে এবং কোনো ক্ষতি বা উপকার তার অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই বদনজর নিয়ে অমূলক ভয়, কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ না করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।

বদনজর সত্য— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা:

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْعَيْنُ حَقٌّ

‘বদনজর সত্য।’ (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসলিম ২১৮৭)

হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنَ الْعَيْنِ، فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ

‘তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কারণ বদনজর সত্য।’ (ইবন মাজাহ ৩৫০৮)

কীভাবে বুঝবেন বদনজর লেগেছে?

শরিয়তে এমন কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অমুক ব্যক্তির বদনজর লেগেছে। তবে সহিহ হাদিসে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। হজরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন— রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি শিশুকে দেখে বললেন—

اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ

‘তার জন্য ঝাড়ফুঁক করাও; কারণ তার ওপর বদনজরের প্রভাব রয়েছে।’ (বুখারি ৫৭৩৯, মুসলিম ২১৯৭)

আরেক হাদিসে হজরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) বলেন, জাফর (রা.)-এর সন্তানদের শরীর দুর্বল দেখাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের দ্রুত বদনজর লাগে। তখন নবী (সা.) তাদের জন্য ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দেন। (মুসলিম ২১৯৮)

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, কখনো কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা পরিবর্তন বদনজরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এমন উপসর্গ দেখা দিলেই নিশ্চিতভাবে বদনজর হয়েছে— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি শরঈ রুকইয়াহ করা উচিত।

বদনজরের প্রতিকার কী?

১. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা:

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস পড়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এগুলো বদনজর ও সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

২. জিবরিল (আ.)-এর শেখানো দোয়া:

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, জিবরিল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেন—

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি আরক্বিকা, মিন কুল্লি শাই’ইন ইউ’জিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আ’ইনিন হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।’

অর্থ: ‘আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি—প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট এবং প্রত্যেক হিংসুকের বদনজর থেকে। আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি।’ (মুসলিম ২১৮৬)

৩. বদনজরদাতাকে জানা গেলে:

সহিহ হাদিসে এসেছে, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় কার বদনজর লেগেছে, তাহলে তাকে অজু বা গোসল করতে বলা হবে এবং সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়া হবে। (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসনাদ আহমাদ ১৫৯৮০)

যেসব কাজের শরয়ি ভিত্তি নেই:

বদনজর দূর করার নামে—

#পশুর হাড় ঝুলিয়ে রাখা,
#তাবিজকে নিজে নিজে কার্যকর মনে করা,
#সোনা বা রূপা ধোয়া পানি পান করাকে সুন্নাহ মনে করা,

বিভিন্ন কুসংস্কার ও লোকজ বিশ্বাস অনুসরণ করা—

এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য শরঈ প্রমাণ নেই। একজন মুসলিমের উচিত কুরআন, সহিহ হাদিস ও বৈধ রুকইয়াহর ওপর নির্ভর করা।

বদনজর বাস্তব এবং এটি কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এর কারণে অতিরিক্ত ভয়, সন্দেহ বা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া ইসলামের শিক্ষা নয়। কোনো অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে কুরআনের আয়াত, মাসনুন দোয়া এবং শরয়িসম্মত রুকইয়াহর মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করাই একজন মুমিনের পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিংসুকের অনিষ্ট, বদনজর এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন। তিনি আমাদের ঈমান, পরিবার ও নেয়ামতসমূহকে তাঁর বিশেষ নিরাপত্তায় রাখুন। আমিন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

প্রেক্ষাপট: দুই দিনের সফরে আগামীকাল ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বদনজর কি সত্য? কারো বদনজর লেগেছে কিনা বুঝবেন কীভাবে?

আপডেট সময় ০৮:১০:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধানের অংশ। কখনো রোগ, কখনো আর্থিক সংকট, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ— আবার কখনো বদনজর (আল-আ’ইন)-এর মাধ্যমেও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করেন।

ইসলাম বদনজরকে কুসংস্কার বলে অস্বীকার করেনি; বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে এর বাস্তবতা স্বীকৃত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইসলাম শিক্ষা দেয়, সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে এবং কোনো ক্ষতি বা উপকার তার অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই বদনজর নিয়ে অমূলক ভয়, কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ না করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।

বদনজর সত্য— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা:

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْعَيْنُ حَقٌّ

‘বদনজর সত্য।’ (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসলিম ২১৮৭)

হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنَ الْعَيْنِ، فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ

‘তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কারণ বদনজর সত্য।’ (ইবন মাজাহ ৩৫০৮)

কীভাবে বুঝবেন বদনজর লেগেছে?

শরিয়তে এমন কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অমুক ব্যক্তির বদনজর লেগেছে। তবে সহিহ হাদিসে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। হজরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন— রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি শিশুকে দেখে বললেন—

اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ

‘তার জন্য ঝাড়ফুঁক করাও; কারণ তার ওপর বদনজরের প্রভাব রয়েছে।’ (বুখারি ৫৭৩৯, মুসলিম ২১৯৭)

আরেক হাদিসে হজরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) বলেন, জাফর (রা.)-এর সন্তানদের শরীর দুর্বল দেখাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের দ্রুত বদনজর লাগে। তখন নবী (সা.) তাদের জন্য ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দেন। (মুসলিম ২১৯৮)

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, কখনো কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা পরিবর্তন বদনজরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এমন উপসর্গ দেখা দিলেই নিশ্চিতভাবে বদনজর হয়েছে— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি শরঈ রুকইয়াহ করা উচিত।

বদনজরের প্রতিকার কী?

১. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা:

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস পড়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এগুলো বদনজর ও সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

২. জিবরিল (আ.)-এর শেখানো দোয়া:

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, জিবরিল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেন—

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি আরক্বিকা, মিন কুল্লি শাই’ইন ইউ’জিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আ’ইনিন হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।’

অর্থ: ‘আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি—প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট এবং প্রত্যেক হিংসুকের বদনজর থেকে। আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি।’ (মুসলিম ২১৮৬)

৩. বদনজরদাতাকে জানা গেলে:

সহিহ হাদিসে এসেছে, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় কার বদনজর লেগেছে, তাহলে তাকে অজু বা গোসল করতে বলা হবে এবং সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়া হবে। (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসনাদ আহমাদ ১৫৯৮০)

যেসব কাজের শরয়ি ভিত্তি নেই:

বদনজর দূর করার নামে—

#পশুর হাড় ঝুলিয়ে রাখা,
#তাবিজকে নিজে নিজে কার্যকর মনে করা,
#সোনা বা রূপা ধোয়া পানি পান করাকে সুন্নাহ মনে করা,

বিভিন্ন কুসংস্কার ও লোকজ বিশ্বাস অনুসরণ করা—

এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য শরঈ প্রমাণ নেই। একজন মুসলিমের উচিত কুরআন, সহিহ হাদিস ও বৈধ রুকইয়াহর ওপর নির্ভর করা।

বদনজর বাস্তব এবং এটি কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এর কারণে অতিরিক্ত ভয়, সন্দেহ বা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া ইসলামের শিক্ষা নয়। কোনো অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে কুরআনের আয়াত, মাসনুন দোয়া এবং শরয়িসম্মত রুকইয়াহর মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করাই একজন মুমিনের পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিংসুকের অনিষ্ট, বদনজর এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন। তিনি আমাদের ঈমান, পরিবার ও নেয়ামতসমূহকে তাঁর বিশেষ নিরাপত্তায় রাখুন। আমিন।