আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ধর্ষণ পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য ও মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর একটি। এই অপরাধ শুধু একজন নারীর শরীরকে নয়, তার আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তাবোধ এবং মানসিক জগতকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটি অভিযোগ তোলা হয়— ধর্ষণের শিকার নারীকে ন্যায়বিচার পেতে নাকি চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হয়। অনেকের কাছে বিষয়টি এতটাই অযৌক্তিক মনে হয় যে তারা ইসলামি আইনকে কঠোর বা অবাস্তব বলে মনে করেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো— এটি ইসলামের বিধান সম্পর্কে বহুল প্রচলিত একটি ভুল ধারণা। ইসলামি শরিয়তে ধর্ষণ ও ব্যভিচার (জিনা) এক বিষয় নয়, আর এ দুই অপরাধের প্রমাণ ও বিচার পদ্ধতিও এক নয়।
আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন হুদা টিভির এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ডা. জাকির নায়েক।
চার সাক্ষীর বিধান কোথায় প্রযোজ্য?
এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, অনেক মুসলিম ও অমুসলিম মনে করেন যে ইসলামি আইনে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চারজন সাক্ষী প্রয়োজন। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
মানুষ মূলত জিনা বা ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সঙ্গে ধর্ষণের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে।
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কেউ যদি কোনো পবিত্র ও নির্দোষ নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, তবে সেই অভিযোগ প্রমাণ করতে তাকে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। যদি সে তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অভিযোগকারী নিজেই শাস্তিযোগ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً
‘আর যারা সতী-সাধ্বী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের ৮০ (আশি) বেত্রাঘাত করো।’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ৪)
অর্থাৎ চার সাক্ষীর শর্তটি ধর্ষণের জন্য নয়; বরং কাউকে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ধর্ষণ ও জিনা এক নয়:
ডা. জাকির নায়েক বলেন, জিনা সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের সম্মতিতে। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজনের ওপর জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়।
তাই ইসলামী আইনবিদরা ধর্ষণকে সাধারণ ব্যভিচার নয়, বরং ‘হিরাবাহ’ বা সমাজে ভয়, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেছেন।এই প্রসঙ্গে তারা কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ
‘যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি হলো— হত্যা করা, অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা।’ (সুরা আল-মায়েদাহ: আয়াত ৩৩)
ইসলামি আইনবিদদের মতে, ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ; যা সমাজে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। তাই এটি হিরাবাহর আওতায় বিবেচিত হতে পারে।
ধর্ষণ প্রমাণে কী ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য?
ডা. জাকির নায়েকের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষীর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই ক্ষেত্রে দুইজন সাক্ষী, ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য পরিস্থিতিগত বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (Circumstantial Evidence) গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সমস্ত প্রমাণ বিবেচনার পর বিচারক যদি নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিই অপরাধী, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি কার্যকর হতে পারে।
যদি অপরাধ শতভাগ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হয়, তবে অপরাধের মাত্রা ও প্রমাণের শক্তি অনুযায়ী অন্যান্য শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।
ইসলামি আইনবিদদের মতামত:
ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে, ধর্ষককে নির্ধারিত শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীকে তার মর্যাদা অনুযায়ী উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।
অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং সুফিয়ান সাওরী (রহ.) মনে করেন, নির্ধারিত শাস্তিই যথেষ্ট; আলাদা ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য নয়।
তবে মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে সকলেই একমত— ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী কোনো শর্ত নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের একটি ঘটনা:
ডা. জাকির নায়েক উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মদিনায় একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাটি আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে।
এক নারী রাতে নামাজের উদ্দেশ্যে বের হলে এক ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে অন্য একজনকে দেখে তিনি ভুলবশত তাকে অপরাধী মনে করেন। লোকজন সেই ব্যক্তিকে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগেই প্রকৃত অপরাধী নিজে সামনে এসে অপরাধ স্বীকার করে।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দোষ ব্যক্তিকে মুক্ত করে দেন এবং প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ দেন।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে ভুক্তভোগী নারীর কাছে চারজন সাক্ষী দাবি করা হয়নি। বরং পরিস্থিতিগত তথ্য ও অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েই বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ইসলামী নীতি:
ইসলাম অত্যাচারীর পক্ষ নেয় না; বরং নির্যাতিতের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ
‘মজলুমের (নির্যাতিতের) দোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।’ (বুখারি)
এই হাদিস ইসলামি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে— নির্যাতিত মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ধর্ষণ প্রমাণে চারজন সাক্ষী প্রয়োজন—এ ধারণা ইসলামের প্রকৃত বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চার সাক্ষীর শর্তটি ব্যভিচারের অপবাদ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ধর্ষণের ক্ষেত্রে নয়।
ইসলামি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি জঘন্য ও ভয়াবহ অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক আলামত, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণসহ বিভিন্ন উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয়। অপরাধ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অতএব, ইসলামের বিচারব্যবস্থাকে বোঝার ক্ষেত্রে আবেগ বা প্রচলিত ভুল ধারণার পরিবর্তে কুরআন, সুন্নাহ এবং স্বীকৃত ইসলামি আইনবিদদের ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়গুলো বিচার করা জরুরি। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নির্যাতিতের অধিকার রক্ষা এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা— এসবই ইসলামি শরিয়তের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















