আকাশ জাতীয় ডেস্ক :
অতীতের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে আগামী নির্বাচনে দেশবাসীর সমর্থন চেয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারও আপনাদের সমর্থন চাই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে প্রচারিত ৩৭ মিনিটের বক্তব্যে দেশ পরিচালনায় জনগণের জন্য কী করতে চান, কীভাবে তাঁর প্রণীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, তা তুলে ধরেন তিনি।
জনগণের কাছে জবাবদিহির বিকল্প নেই-
তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনোই বিকল্প নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় আপনাদের সমর্থন পেলে দেশের আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায়, বিএনপি সরকার ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার, বিএনপির অঙ্গীকার। আপনাদের কাছে আমার অঙ্গীকার। কারণ আপনারাই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত দেশ প্রতিষ্ঠা-
সব শহীদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম– ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে অসংখ্য মানুষ দেশের জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছেন।
তারেক রহমান বলেন, একটি প্রাণের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা ও সম্ভাবনা। কোনো কিছুর বিনিময়েই সেই ক্ষতির পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা যারা এখনও বেঁচে আছি, আমাদের দায়িত্ব হলো শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলাই হতে পারে দেশ ও জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত সব প্রাণের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি যদি বিএনপি আপনাদের সমর্থন পায়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র থাকবে মহানবীর মহান আদর্শ ন্যায়পরায়ণতা। জনগণের বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই দিনে আমি আল্লাহর দরবারে ধানের শীষের বিজয় কামনা করছি।
জনগণ ধর্মীয় চরমপন্থা ও উগ্রবাদ পছন্দ করে না-
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ করতে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের– এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধেও কে কোন ধর্মের, কার কি ধর্মীয় পরিচয়– এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। আমরা মনে করি, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।
তিনি আরও বলেন, দেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ তাদের স্বাধীনতা হরণকারী স্বৈরাচার, ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ– কোনোটিকেই পছন্দ করে না। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি বজায় রেখেই যাতে আমরা সবাই মিলেমিশে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারি। দল, মত, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে এই বাংলাদেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই বাংলাদেশি।
ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে এই নির্বাচন একটি বড় সুযোগ-
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের মোট জনশক্তির অর্ধেকের বেশি নারী। জনসংখ্যার চার কোটির বেশি তরুণ, পাঁচ কোটির বেশি শিশু, ৪০ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ, কোটি কোটি শ্রমিক ও কৃষক– এই সব শ্রেণিপেশার মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রযন্ত্রই দুর্বল হয়ে পড়বে। নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ডেমোক্রেসি ডেভেলপমেন্ট কিংবা ডিসেন্ট্রালাইজেশন– কোনো কিছুই টেকসই হবে না। প্রতিটি নাগরিকের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন একটি বড় সুযোগ।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে পরিকল্পনা সাজিয়েছি-
বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের নানা বিষয় তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপির সব পরিকল্পনা, বিশেষ করে দেশের সব তরুণ-তরুণী বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার বিএনপির প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র ও সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জনগণের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি। সারাদেশের ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী-শ্রমজীবী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা শিল্প উদ্যোক্তা এবং দেশের সব মা-বোনেরা– সবার কাছে আমার বিনীত আবেদন, আপনারা যারা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন, খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন, তাহলে ধানের শীষকে বিজয়ী করুন। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ বাংলাদেশের বিজয়। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ স্বাধীন, সার্বভৌম, তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশ।
১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন-
গত নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদ আমলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি তথাকথিত ডামি নির্বাচনে আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম, ৭ জানুয়ারি সারাদিন পরিবারকে সময় দিন। বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে এবার দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন। তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান রেখে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন। ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবেন।
দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে-
তারেক রহমান বলেন, পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ অপশক্তি দেশের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। প্রশাসনকে চূড়ান্ত রকমের দলীয়করণ করে ফেলেছিল। প্রশাসন পরিচালনায় বিএনপির নীতি হবে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সাংবিধানিক নিয়মে। প্রশাসনকে দলীয়করণ নয়, প্রশাসনের নিয়ম কিংবা পদোন্নতি হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা এবং বাস্তবায়ন করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, বেকারদের কর্মসংস্থান, বেকার ভাতা চালু, সংবিধানে আল্লাহ ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, প্রবাসী কার্ড, বিদেশে চাকরি পেলে তাদের অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে ঋণ সুবিধা প্রদান প্রভৃতি বিষয়ে দলের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, আমাদের এই ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সামাজিক রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানোর অপচেষ্টা হয়েছিল। অন্যদিকে দেশবরেণ্য অনেক আলেম-ওলামা সোচ্চার কণ্ঠে বলেছেন কেউ কেউ স্রেফ দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যা করে বিশ্বাসী মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং সব বিশ্বাসীদের প্রতি আহ্বান, কেউ যেন মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধানের শীষে ভোট চাই-
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আমি এই স্বল্প সময় যতটুকু সম্ভব আপনাদের কাছে ছুটে গেছি। আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি। বিএনপির প্রতি আপনাদের আবেগ ও ভালোবাসা উপলব্ধি করেছি। ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির প্রতি আবারও আপনাদের ভালোবাসা প্রকাশের দিন।
তারেক রহমান বলেন, আমি দেশ ও জনগণের জন্য, আপনার এবং আপনার পরিবারের সদস্যের জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধানের শীষে আপনাদের সমর্থন ও আপনাদের ভোট চাই।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















