ঢাকা ০৮:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কারাগার থেকেই বার কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিতে চান ব্যারিস্টার সুমন সংসদীয় সার্বভৌমত্বের নামে ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’ কায়েম হচ্ছে: সারোয়ার তুষার টিকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আবেদন পহেলা বৈশাখ আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক : প্রধানমন্ত্রী গণভোটের রায় মেনে নিন, না হলে করুণ পরিণতি হবে: গোলাম পরওয়ার আগামী শিক্ষাবর্ষে ৪র্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া জোরদার হচ্ছে : ভারতীয় হাইকমিশনার হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বিএনপি এখন একটা কৃত্রিম বিরোধ বা সংকট তৈরি করছে: নাহিদ ইসলাম

ঐতিহ্যবাহী খাবার কাজীর ভাত!

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

কাজীর ভাত! গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ভিন্ন স্বাদের মজার এ খাবারটি। এক সময়ে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরেই একটি নির্দিষ্ট সময় ঘটা করে আয়োজন করা হতো ‘কাজীর ভাতের’।

কাজীর ভাত রান্না উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনদের মিলনমেলা হতো। কাজীর ভাত রান্নাকে ঘিরে সকালটা থাকতো উৎসব মুখোর। তবে শহুরে সংস্কৃতির প্রভাবে দিন দিন গ্রামের এ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, কাজীর ভাত সাধারণত বছরের চৈত্র মাসে গ্রামের প্রায় ঘরেই রান্না করা হয়। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে রান্না করা হলেও গরমে এ ভাতের আয়োজনটা বেশি হয়ে থাকে। কাজীর ভাতের প্রধান এবং অন্যতম আকর্ষণ হলো নানা রকম ভর্তার সমাহার এবং ইলিশ, পুঁটি মাছ, চাপিলা বা বাটা মাছ কড়া করে ভাজা।

দেখতে সাধারণ ভাতের মতো হলেও কাজীর ভাত এক বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। এর স্বাদ ও গন্ধও আলাদা। এ ভাত রান্না করতে হলে আধা সেদ্ধ চাল কমপক্ষে সাতদিন মাটির হাঁড়িতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। সাতদিনের একদিন আগে রান্না করলেও এর প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাবে না। অনেকে আট/নয়দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখেও এ ভাত রান্না করে থাকে। সে ক্ষেত্রে টক গন্ধ বেশ তীব্র হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রতিদিন সাধারণ ভাত রান্নার সময় কিছুটা জ্বাল হওয়ার পর কিছুটা পানিসহ একটু চাল মাটির চুলার পাশেই রাখা হাঁড়িতে তুলে রাখা হয়। এভাবে অন্তত সাতদিন রাখার পর জমানো পানিসহ চাল থেকে এক ধরনের টক গন্ধ বের হলেই তা কাজীর ভাত রান্নার উপযোগী হয়। রান্নার সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখা চাল ভালো করে ধুয়ে সাধারণ রান্নার মতোই ভাত রান্না করা হয়। ভাত হয়ে এলে টক গন্ধ বের হয়। অনেকে আবার ভুনা খিচুরির মতো করেও রান্না করে থাকে। তবে সাদা ভাতের মতোই বেশির ভাগ রান্না হয়ে থাকে।

অতীতে কাজীর ভাতের জন্য চাল ভিজিয়ে রাখার জন্য শুধুমাত্র নতুন বা পুরনো মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করার রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে যে কোনো পাত্রেই চাল ভিজিয়ে রাখা হয়। কাজীর ভাতের সঙ্গে আয়োজন করা হয় নানান পদের ভর্তার। মূলত এ ভর্তাই কাজীর ভাতের প্রধান আকর্ষণ।

গৃহবধূ আরিশা জান্নাত বলেন, ভর্তা যত বেশি হবে, কাজীর ভাতের স্বাদ তত বাড়বে। ভর্তার মধ্যে রয়েছে কালোজিরা ভর্তা, কাঁচামরিচের সঙ্গে রসুন ভর্তা, বাদাম ভর্তা, দেশি ও বিলেতি ধনিয়া পাতা ভর্তা, কুমড়া/কুমড়ার খোসা ভর্তা, পটলের খোসা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, কচু ভর্তা, চিংড়ি মাছ ভর্তা, ইলিশ মাছের মাথা ভর্তা, পেঁয়াজ-মরিচ ভর্তা, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, শুকনা মরিচ ভর্তা, সরিষা ভর্তা, ছোট মাছের শুঁটকি ভর্তা ও টাকি মাছ ভর্তা কাজীর ভাতে থাকতেই হবে। ভর্তার সঙ্গে ইলিশ, পুঁটি, চাপিলাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ ভাজা (ভাজি) দিয়েও পরিবেশন করা হয় কাজীর ভাত।

তানজিল চৌধুরী নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, ছোট সময়ে যখন গ্রামের বাড়িতে থাকতাম, তখন মাঝে মধ্যেই কাজীর ভাত রান্না করা হতো। বাড়িতে রান্না করা কাজীর ভাতের গন্ধ এখনো নাকে লেগে আছে। ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এখানে খুব একটা খাওয়া হয় না। এখনকার অনেক গৃহবধূই কাজীর ভাতকে গুরুত্ব দেয় না। অনেকে রান্না করতেই জানে না। দুই/এক বছর পর পর সুযোগ হয় কাজীর ভাত খাওয়ার।

কাজীর ভাত সাধারণত বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল অঞ্চলের একটি বিশেষ খাবার। বর্তমানে খুব বেশি প্রচলিত না হলেও গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোতে বছরে দুই/একবার কাজীর ভাত রান্না হয়। মাদারীপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর এবং বরিশালের বিভিন্ন এলাকাতেও কাজীর ভাত রান্না করা হয়ে থাকে। কাজীর ভাতে টক স্বাদ ও টক গন্ধ বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে অপছন্দের হলেও বয়স্কদের কাছে অনেক প্রিয় কাজীর ভাত। বর্তমান সময়ে গ্রামীণ সমাজে শহুরে জীবনযাত্রার প্রবেশের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য গ্রামীণ ঐতিহ্য। কাজীর ভাত হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খাবারেরই একটি অংশ।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

ঐতিহ্যবাহী খাবার কাজীর ভাত!

আপডেট সময় ১১:৪৯:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর ২০২১

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

কাজীর ভাত! গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ভিন্ন স্বাদের মজার এ খাবারটি। এক সময়ে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরেই একটি নির্দিষ্ট সময় ঘটা করে আয়োজন করা হতো ‘কাজীর ভাতের’।

কাজীর ভাত রান্না উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনদের মিলনমেলা হতো। কাজীর ভাত রান্নাকে ঘিরে সকালটা থাকতো উৎসব মুখোর। তবে শহুরে সংস্কৃতির প্রভাবে দিন দিন গ্রামের এ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, কাজীর ভাত সাধারণত বছরের চৈত্র মাসে গ্রামের প্রায় ঘরেই রান্না করা হয়। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে রান্না করা হলেও গরমে এ ভাতের আয়োজনটা বেশি হয়ে থাকে। কাজীর ভাতের প্রধান এবং অন্যতম আকর্ষণ হলো নানা রকম ভর্তার সমাহার এবং ইলিশ, পুঁটি মাছ, চাপিলা বা বাটা মাছ কড়া করে ভাজা।

দেখতে সাধারণ ভাতের মতো হলেও কাজীর ভাত এক বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। এর স্বাদ ও গন্ধও আলাদা। এ ভাত রান্না করতে হলে আধা সেদ্ধ চাল কমপক্ষে সাতদিন মাটির হাঁড়িতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। সাতদিনের একদিন আগে রান্না করলেও এর প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাবে না। অনেকে আট/নয়দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখেও এ ভাত রান্না করে থাকে। সে ক্ষেত্রে টক গন্ধ বেশ তীব্র হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রতিদিন সাধারণ ভাত রান্নার সময় কিছুটা জ্বাল হওয়ার পর কিছুটা পানিসহ একটু চাল মাটির চুলার পাশেই রাখা হাঁড়িতে তুলে রাখা হয়। এভাবে অন্তত সাতদিন রাখার পর জমানো পানিসহ চাল থেকে এক ধরনের টক গন্ধ বের হলেই তা কাজীর ভাত রান্নার উপযোগী হয়। রান্নার সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখা চাল ভালো করে ধুয়ে সাধারণ রান্নার মতোই ভাত রান্না করা হয়। ভাত হয়ে এলে টক গন্ধ বের হয়। অনেকে আবার ভুনা খিচুরির মতো করেও রান্না করে থাকে। তবে সাদা ভাতের মতোই বেশির ভাগ রান্না হয়ে থাকে।

অতীতে কাজীর ভাতের জন্য চাল ভিজিয়ে রাখার জন্য শুধুমাত্র নতুন বা পুরনো মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করার রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে যে কোনো পাত্রেই চাল ভিজিয়ে রাখা হয়। কাজীর ভাতের সঙ্গে আয়োজন করা হয় নানান পদের ভর্তার। মূলত এ ভর্তাই কাজীর ভাতের প্রধান আকর্ষণ।

গৃহবধূ আরিশা জান্নাত বলেন, ভর্তা যত বেশি হবে, কাজীর ভাতের স্বাদ তত বাড়বে। ভর্তার মধ্যে রয়েছে কালোজিরা ভর্তা, কাঁচামরিচের সঙ্গে রসুন ভর্তা, বাদাম ভর্তা, দেশি ও বিলেতি ধনিয়া পাতা ভর্তা, কুমড়া/কুমড়ার খোসা ভর্তা, পটলের খোসা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, কচু ভর্তা, চিংড়ি মাছ ভর্তা, ইলিশ মাছের মাথা ভর্তা, পেঁয়াজ-মরিচ ভর্তা, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, শুকনা মরিচ ভর্তা, সরিষা ভর্তা, ছোট মাছের শুঁটকি ভর্তা ও টাকি মাছ ভর্তা কাজীর ভাতে থাকতেই হবে। ভর্তার সঙ্গে ইলিশ, পুঁটি, চাপিলাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ ভাজা (ভাজি) দিয়েও পরিবেশন করা হয় কাজীর ভাত।

তানজিল চৌধুরী নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, ছোট সময়ে যখন গ্রামের বাড়িতে থাকতাম, তখন মাঝে মধ্যেই কাজীর ভাত রান্না করা হতো। বাড়িতে রান্না করা কাজীর ভাতের গন্ধ এখনো নাকে লেগে আছে। ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এখানে খুব একটা খাওয়া হয় না। এখনকার অনেক গৃহবধূই কাজীর ভাতকে গুরুত্ব দেয় না। অনেকে রান্না করতেই জানে না। দুই/এক বছর পর পর সুযোগ হয় কাজীর ভাত খাওয়ার।

কাজীর ভাত সাধারণত বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল অঞ্চলের একটি বিশেষ খাবার। বর্তমানে খুব বেশি প্রচলিত না হলেও গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোতে বছরে দুই/একবার কাজীর ভাত রান্না হয়। মাদারীপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর এবং বরিশালের বিভিন্ন এলাকাতেও কাজীর ভাত রান্না করা হয়ে থাকে। কাজীর ভাতে টক স্বাদ ও টক গন্ধ বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে অপছন্দের হলেও বয়স্কদের কাছে অনেক প্রিয় কাজীর ভাত। বর্তমান সময়ে গ্রামীণ সমাজে শহুরে জীবনযাত্রার প্রবেশের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য গ্রামীণ ঐতিহ্য। কাজীর ভাত হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খাবারেরই একটি অংশ।