অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই বলে একটি গোলটেবিল আলোচনায় একজন বক্তার প্রশ্নের জবাবে জানিয়েয়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
মন্ত্রী জানান, পাঁচটি সংস্থাকে দিয়ে তালিকা করে অভিযান চালানো হচ্ছে। যাদের নাম সব তালিকায় আছে, তাদেরকেই ধরা হচ্ছে।
মাদকবিরোধী অভিযান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে শনিবার রাজধানীর ইস্কাটনের বিজ মিলনায়তনে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখছিলেন মন্ত্রী।
টেলিভিশন টকশো উপস্থাপক জিল্লুল রহমানের সঞ্চালনায় বৈঠকে বর্তমান সংসদ সদস্য, বিএনপির সাবেক দুই সংসদ সদস্য ছাড়াও ব্যবসায়ী, কলামিস্ট, সম্পাদক, শিক্ষক, চিকিৎসকরা অংশ নেন।
গত ৪ মে থেকে সারাদেশে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৫০ জনের বেশি সন্দেজভাজন মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তাদের ওপর গুলি করার পর পাল্টা গুলিতে নিহত হয়েছেন ‘মাদক কারবারিরা’। তবে মানবাধিকার কর্মীরা এই বর্ণনায় আস্থা রাখছেন না। তারা একে বিচার বহির্ভুত হত্যা বলছেন। বিএনপিও এভাবে বন্দুকের ব্যবহারকে নিন্দা জানিয়েছে।
বিএনপি নেতাদের ক্রমাগত অভিযোগ, এই অভিযানের আসল উদ্দেশ্য তাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার জনগণকে ভয় দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
আলোচনায় বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। জবাবে তিনি বলেন, ‘এটার কোন প্রশ্নই আসে না। আমরা মাদক ব্যবসায়ীকে ধরছি। জাফর ভাই আপনি ভুলেও চিন্তা করবেন না, আমরা কোনও বিরোধী দলকে নাকানিচুবানি করতে অভিযান চালাচ্ছি না। কোনও বিরোধী দল দমনে আমরা এই যুদ্ধে নামিনি।’
বিএনপির আরেক সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে রাজনৈতিক মাঠটা শেয়ার করতে কি সমস্যা? বিরোধী দলকে সভা করতে দেন না। মিছিল করতে দেন না’।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আখতার ভাই এই বিষয় আরেক দিন বসব আপনার সাথে।’ এ সময় সভা কক্ষে হাসির রোল পড়ে।
কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হককে ডেকে নিয়ে র্যাবের গুলি করে হত্যার যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে মন্ত্রীর কাছে জানতে চান বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, Ôআমি সবসময় বলি, আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে; তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হোক না কেন।’
‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং এই বিষয় যদি তারা কোনও ভুল কর্ম করে থাকে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। হোক সে জনপ্রতিনিধি, সে সরকার দলীয় নেতা বা আইনশৃংখলা বাহিনীর লোক। আমাদের দুইজন সংসদ সদস্য জেলখানায় আছেন। কোনও সরকারের আমলে এমনটি দেখা যায়নি।’
‘মাদক কারবারি থাকলে ফায়ারিং হবেই’
মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকের ব্যবহার নিয়ে মন্ত্রী বলেন, Ôযেখানেই অবৈধ মাদক ব্যবসা সেখানেই অবৈধ অস্ত্র, সেখানেই অবৈধ টাকা। এই তিনটার সমন্বয়ে যেখানে হয় সেখানে এই ফায়ারিং হবেই। পৃথিবীর সব দেশেই তাই।’
‘আমরা কাউকে হত্যা করার জন্য কখনও চিন্তা করি না। যেখানেই নিরাপত্তাবাহিনী বাধাপ্রাপ্ত হয় সেখানেই এই ধরনের ফায়ারিং হয়ে থাকে।’
কেউ যদি আমাদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের গুলি করে তারা কি ছেড়ে দেবে? তারা কি প্রাণটা দিয়ে দেবে?’
অভিযানে কেবল প্রাণহানির বিষয়টি সামনে আসছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মন্ত্রী। বলেন, ‘কেবল বলেন, হত্যা কেন হচ্ছে? এটা তো কখনও শুনি না আজকে এক মাসে কতজন মানুষকে বিচারের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছি, কোর্টে হাজির করেছি বা কত জনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
‘প্রধানমন্ত্রী টেকনাফে নজর দিতে বলেছেন’
মন্ত্রী জানান, তিনি যখন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তখন তাকে কক্সবাজারের টেকনাফের দিকে নজর দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
টেকনাফকে মিয়ানমার থেকে মাদক পাচারের রুট হিসেবে দেখা হয়। মন্ত্রী বলেন, ‘আমি তখন দেখেছিলাম সেখানকার মাদকের ভয়াবহতা। পরে এক সপ্তাহের মধ্যে ওই এলাকার দুই থানার ওসি থেকে শুরু করে পুলিশের কনস্টেবল পর্যন্ত পরিবর্তন করেছিলাম।’
‘অভিযান সাফল্যের দোরগোড়ায়’
চলমান অভিযান সাফলের দ্বারপ্রান্তে জনিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মাদক বন্ধে সব কিছু করছি। আমরা সফলতার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। মাদকের কারবারিদের সব কিছু আমাদের হাতে আছে। ধৈর্য ধরুন, সব কিছু আমরা করতে পারব।Õ
মসজিদের ইমাম, রাজনীতিক, সাংবাদিকদেরকে মাদকের কুফল সম্পর্কে প্রচার করতে বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সমাজের সকলকে নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। যেমন সমাজের সকলকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাস বন্ধ করতে পেরেছি, ঠিক তেমনি মাদক নিয়ে আমরা সফলতা আনব।’
‘মিয়ানমার সহযোগিতা করছে না’
বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে সিংহভাগ ইয়াবায় আসক্ত বলে ধারণা করা হয়। আর এই মাদকটি আসে মিয়ানমার থেকে। এ বিষয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তারা। কিন্তু মিয়ানমার এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে না।
‘মিয়ানমার সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আন সান সুচিকে বলেছিলাম ইয়াবার ভয়াবহতা সম্পর্কে। ইয়াবা আসক্তে হয়ে ঐশির মতো মেয়ে তার বাবা মাকে হত্যা করেছে। এসব কথা বলা হলে সু চি বলেন, তাদের দেশেও এমন সমস্যা প্রতিনিয়ত ফেস করতে হচ্ছে। কিন্তু তারা বন্ধ করতে পারছে না আমরা উদ্যোগী হলে তারা বন্ধ করবে।’
‘কিন্তু তখনও সে আমাদের আশ্বস্ত করলেও তার কোন বাস্তবতা দেখিনি।’
মন্ত্রী বলেন, ‘পাশ্ববর্তী দেশগুলো থেকে মাদক আমাদের দেশে চলে আসে। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি আমাদের বর্ডার লাইন। এতো ক্রস বর্ডার বিশ্বের কম দেশেই আছে।’
‘এছাড়া নাফ নদী থেকে শুরু করে নাইক্ষ্যংছড়ি পার হয়ে বান্দরবনের দিকে যেতে গেলে একেক রকম রাস্তা। আর এসব কারণে মাদকের আনাগোনা বাড়ে।’
রোহিঙ্গারা দেশে আসার পর থেকে নাফ নদী দিয়ে এই মুহূর্তে ইয়াবা আসে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কোস্টগার্ড, বিজিবি ও পুলিশের কড়া নজরদারিতে এটা বন্ধ হয়েছে।’
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢেলে সাজানো হচ্ছে’
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নতুন করে সাজানোর কথাও জানান মন্ত্রী। বলেন, ‘তাদের ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনী সব কিছু সমৃদ্ধি করার চেষ্টা করছি। লোকবল বৃদ্ধিরও চেষ্টা চলছে। যাতে মাদক অধিদপ্তর শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত হয়।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















