অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
আজও মেলেনি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিদেশিদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগও সীমিত। কারণ জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৫ সালে। আর্মেনিয়ায় গণহত্যার বিষয়ে দেশটির প্রস্তাবের ভিত্তিতে দিবসটি ঘোষণা করা হয়। ফলে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণা’ আদায় করা খুব সহজ হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জাতীয় সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা নেই।
তবে দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না মিললেও ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আজ ২৫ মার্চ প্রথমবারের মতো দেশে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে।
সরকারিভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরেশোরে না হলেও বেসরকারিভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ না হওয়ায় এসব প্রচেষ্টা সফল হচ্ছে না।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে রাজধানী ঢাকায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের পাকহানাদার বাহিনীর ওই অভিযানে সেদিনের কালরাতে ঠিক কতজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব পাওয়া দুষ্কর। তবে ওই সময়ে যেসব বিদেশি সাংবাদিক ঘটনার ওপর প্রতিবেদন করেছিলেন, সেখানে সাত হাজার থেকে ৩৫ হাজার পর্যন্ত মানুষকে নির্বিচারে হত্যার বর্ণনা পাওয়া যায়। ্এরপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, পাকবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করে। বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের সংজ্ঞায় এসবই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ছাড়া গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়েনি।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান শাহরিয়ার কবির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বিকার থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশ সরকার গত বছর ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমরা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে সেমিনার করেছি। তাদের কাছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি। তাদেরকে গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। ওইসব দেশ বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে অনুরোধ পাওয়ার অপেক্ষা করছে। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমন কোনো অনুরোধ এখনও জানানো হয়নি।’
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘আমরা গত ডিসেম্বরে সুইডেনে গণহত্যার দলিলসংবলিত কাগজপত্র দিয়েছি। ওই সময়ে সুইডেনের সরকারের সংশ্লিষ্টরা আমাকে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব দেয়া হলে তারা অবশ্যই এ স্বীকৃতি দেবেন।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যেদিন চাইবে, সেদিনই আমরা স্বীকৃতি দেব। ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। কিন্তু ভারতের কাছে আজ পর্যন্ত গণহত্যার স্বীকৃতি চাওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান এগ্রেসিভভাবে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিইনি। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে নির্বিকার।’
পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক শনিবার বলেন, ‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে কাজ চলছে। অনেক ধরনের কাজ চলছে। প্রথমে আমাদের গ্রাউন্ডওয়ার্ক করা প্রয়োজন। সেটাই এখন আমরা করছি।’ তবে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুই বলেননি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাদিয়া ফয়জুন্নেছা শনিবার বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক উপদেষ্টা আদামা দিয়াঙ্গ সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা ও রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমরা তার কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা চলেছে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য উত্থাপন করেছি। তবে ভবিষ্যতে যাতে কোথাও গণহত্যা না হয়, সে ব্যাপারে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালানোই তার প্রধান কাজ। তাই আমরা এখন বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে যাতে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাব পাস করে, তার জন্য আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে অনুরোধ জানাচ্ছি। ইতিমধ্যে ভারত, ভুটানসহ তিনটি দেশ আমাদের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা একটা চলমান কাজ। এ কাজ আমরা সব সময়ই চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশের সব দূতাবাসে গণহত্যা দিবস পালিত হবে। আমাদের দূতাবাসগুলো স্বাগতিক দেশগুলোকে গণহত্যার বিষয়ে অবহিত রাখছে। জেনোসাইড রিভিজিটেড শিরোনামে আমরা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছি। এ পুস্তিকা আইপিও এবং সিপিএ সম্মেলনের মাধ্যমে বিদেশি এমপিদের হাতে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সফর করে গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। আমরা চাই, বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট থেকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে যেন স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন শনিবার দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করেছে অনেক পরে, ২০১৭ সালে। আজ থেকে আরও ৪০ বছর আগে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা উচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ২০১৭ সালে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই জাতিসংঘ আর্মেনিয়ার অনুরোধে ৯ ডিসেম্বরকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে। এখন আমাদের বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস করিয়ে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করানোর চেষ্টা চালাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য এবং দলিলে বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়টি আরও বেশি করে থাকার ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রেফারেন্স দলিলে থাকা ছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো সাহিত্যে কিংবা দলিলে বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়টি সেভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। রুয়ান্ডা, আর্মেনিয়া, কম্বোডিয়ায় পলপটের আমলের গণহত্যা যেভাবে আন্তর্জাতিক সাহিত্যে ও দলিলে প্রতিষ্ঠিত, বাংলাদেশের গণহত্যা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বাংলাদেশের গণহত্যাকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কিংবা সাধারণ একটা যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগে যেভাবে ২৫ মার্চ রাতে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে কিংবা নয় মাসের যুদ্ধে যেভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে তার বিবরণ আন্তর্জাতিক দলিলে কম দেখা যায়।’
অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, ‘গণহত্যার বিষয় প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ যথেষ্ঠ নয়। এ ব্যাপারে সক্রিয় পদক্ষেপ তেমন দেখা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের গণহত্যা স্টাডির ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিভিন্ন দেশের কাছে উত্থাপন করা যেতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এবং ইউনেস্কোর মতো বিভিন্ন ফোরাম থেকে আমরা স্বীকৃতি আদায় করতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হল, দেশের ভেতরে গণহত্যার বিষয়ে আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা নিজেরাই গণহত্যা দিবস ঘোষণা করেছি বিলম্বে। আরও আগে হলে ভালো হতো।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















