ঢাকা ১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি সংস্কার নিয়ে বিএনপির প্রতারণা জনগণের সঙ্গে: বিরোধীদলীয় নেতা এসডিজি অর্জনে নারী নেতৃত্ব অপরিহার্য : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে আইন সংশোধনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত্রিযাপন না করার পরামর্শ কর্নেল অলির সংসদে ব্যাংক ডাকাতদের ‘ডিম থেরাপি’ দেওয়ার দাবি রেহানা আক্তার রানুর স্বাস্থ্যখাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা জাবের-জুমার

মাইগ্রেনজনিত তীব্র মাথাব্যথা: কারণ, লক্ষণ

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

মাথাব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলেও এটি নিয়ে আমাদের অবহেলার শেষ নেই। শরীরের অন্য যেকোনো বড় রোগকে আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, সাধারণ মাথাব্যথাকে ঠিক ততটাই অবহেলা করি। যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম বা জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি ব্যাহত করে তোলে। অথচ সব মাথাব্যথা এক রকম নয়। প্রচলিত সাধারণ টেনশন টাইপ মাথাব্যথার চেয়ে মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।

মাইগ্রেন কোনো সাধারণ বা প্রতিদিনের হালকা মাথাব্যথা নয়। এটি সাধারণত মানুষের মাথায় হঠাৎ করে তীব্রভাবে আক্রমণ করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘পিরিয়ডিক অ্যাটাক’ বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় এটি মাসে একবার, সপ্তাহে একবার কিংবা দুই-তিন মাস পর পর অত্যন্ত তীব্র ও অসহনীয় আকারে ফিরে আসে।

মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথার মূল কারণসমূহ:
মাইগ্রেন কেন হয়, তার সুনির্দিষ্ট একক কোনো কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারলেও বেশ কিছু প্রভাবক বা ‘ট্রিগার’কে এর জন্য দায়ী করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা টেনশন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অস্থিরতা। যারা সবসময় গভীর চিন্তাগ্রস্ত থাকেন, তাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যা মাইগ্রেনকে উস্কে দেয়।

শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক কারণও এর পেছনে কাজ করে। মানুষের মস্তিষ্কে ‘সেরেটোনিন’ নামক একটি বিশেষ কেমিক্যালের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে বা এর মাত্রা হঠাৎ ওঠানামা করলে রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণের ফলে এই তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এ ছাড়া নারীর ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে যেসব নারী দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল সেবন করেন, তাঁদের মাঝে মাইগ্রেনজনিত জটিলতা অনেক বেশি দেখা যায়।

তীব্রতা ও প্রধান প্রধান লক্ষণ:
মাইগ্রেনের ব্যথার ধরন সাধারণত মাঝারি থেকে অত্যন্ত জটিল বা তীব্র প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এই ব্যথা সাধারণত পুরো মাথায় একসঙ্গে শুরু হয় না, বরং মাথার যেকোনো একটি নির্দিষ্ট পাশে (ডানে কিংবা বামে) বেশি অনুভূত হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক ব্যবস্থা না নিলে বা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা স্থায়ী হলে তা ধীরে ধীরে পুরো মাথায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি সাধারণ মাইগ্রেন অ্যাটাক একটানা ৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে হয় মাথাটা যেন ছিঁড়ে বা ফেটে যাবে। এই তীব্র ব্যথার পাশাপাশি আরও কিছু কষ্টদায়ক উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে রোগীর বমি বমি ভাব হয় এবং অনেক সময় সরাসরি বমি হয়ে যায়। এই সময়ে রোগীর স্নায়ুগুলো এতটাই সংবেদনশীল হয়ে পড়ে যে তিনি তীব্র আলো এবং উচ্চ শব্দ বা কোলাহল একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আলোর দিকে তাকালে বা কোনো শব্দ শুনলে মাথার ভেতরের যন্ত্রণা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই কারণে মাইগ্রেনের রোগীরা ব্যথা শুরু হলে সাধারণত একটি অন্ধকার ঘরে, ঘরের সব আলো ও ফ্যান বা এসি বন্ধ করে সম্পূর্ণ শান্ত পরিবেশে শুয়ে থাকতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

যেসব অভ্যাস পরিহার করা জরুরি:
যাঁদের মাইগ্রেনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে, চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলতে পারলে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে অনেকটাই দূরে থাকা সম্ভব।

প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে পেট খালি রাখার অভ্যাস সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে মানুষের শরীরে গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। এই গ্যাস্ট্রিকের কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও শারীরিক অস্বস্তি সরাসরি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং মাইগ্রেনের ব্যথাকে মুহূর্তের মধ্যে উস্কে দেয়। তাই নির্দিষ্ট সময় পর পর পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ঘুমের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অনিয়ম করা যাবে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো কারণে নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে ৬ ঘণ্টা অবিচ্ছিন্ন ঘুমের প্রয়োজন। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা রাত জেগে ড্রামা বা ওয়েব সিরিজ দেখার যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তৃতীয়ত, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া বা কমিয়ে ফেলা দরকার। রক্তে শর্করার বা সুগারের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে তা শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট করে, যা মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই প্রক্রিয়াজাত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

চতুর্থত, আজকাল কাজের প্রয়োজনে অনেকেরই একটানা কম্পিউটারের বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন শেয়ারিং চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং মাইগ্রেনের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। তাই কাজের মাঝখানে অবশ্যই ছোট ছোট বিরতি নিতে হবে।

পঞ্চমত, শরীরে পানির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা বা ডিহাইড্রেশন রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গরমের দিনে আমাদের শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়ে যাওয়ার কারণে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এই পানিশূন্যতা মাইগ্রেন অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় সবসময় নিরাপদ খাবার পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। প্রতিদিন প্রচুর পানি পানের পাশাপাশি ডাবের পানি, তাজা ফলের খাঁটি রস কিংবা ছাতুর শরবতের মতো স্বাস্থ্যকর পানীয় পান করুন।

ষষ্ঠত, আমাদের দেশের চরম আবহাওয়া মাইগ্রেন বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত কড়া রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ছাতা ছাড়া ঘোরাঘুরি করলে রোদ ও গরমের কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা চট করে শুরু হতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার তারতম্য বা হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেও এই ব্যথার তীব্রতা বাড়তে পারে। তাই রোদে বের হলে অবশ্যই সানগ্লাস, ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার করা উচিত।

দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ:
মাইগ্রেনকে সাধারণ মাথাব্যথা ভেবে যদি কেউ অবহেলা করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সঠিক চিকিৎসা না করিয়ে এই যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন, তবে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেনের রোগীদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে তীব্র ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা এবং ক্রনিক অ্যানজাইটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। তাই এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ অনুসারে নিয়ম মেনে জীবনযাপন ও ওষুধ সেবন করতে হবে।

[সহকারী রেজিস্ট্রার, সিওমেক ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি

মাইগ্রেনজনিত তীব্র মাথাব্যথা: কারণ, লক্ষণ

আপডেট সময় ১১:১০:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

মাথাব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলেও এটি নিয়ে আমাদের অবহেলার শেষ নেই। শরীরের অন্য যেকোনো বড় রোগকে আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, সাধারণ মাথাব্যথাকে ঠিক ততটাই অবহেলা করি। যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম বা জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি ব্যাহত করে তোলে। অথচ সব মাথাব্যথা এক রকম নয়। প্রচলিত সাধারণ টেনশন টাইপ মাথাব্যথার চেয়ে মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।

মাইগ্রেন কোনো সাধারণ বা প্রতিদিনের হালকা মাথাব্যথা নয়। এটি সাধারণত মানুষের মাথায় হঠাৎ করে তীব্রভাবে আক্রমণ করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘পিরিয়ডিক অ্যাটাক’ বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় এটি মাসে একবার, সপ্তাহে একবার কিংবা দুই-তিন মাস পর পর অত্যন্ত তীব্র ও অসহনীয় আকারে ফিরে আসে।

মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথার মূল কারণসমূহ:
মাইগ্রেন কেন হয়, তার সুনির্দিষ্ট একক কোনো কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারলেও বেশ কিছু প্রভাবক বা ‘ট্রিগার’কে এর জন্য দায়ী করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা টেনশন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অস্থিরতা। যারা সবসময় গভীর চিন্তাগ্রস্ত থাকেন, তাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যা মাইগ্রেনকে উস্কে দেয়।

শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক কারণও এর পেছনে কাজ করে। মানুষের মস্তিষ্কে ‘সেরেটোনিন’ নামক একটি বিশেষ কেমিক্যালের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে বা এর মাত্রা হঠাৎ ওঠানামা করলে রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণের ফলে এই তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এ ছাড়া নারীর ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে যেসব নারী দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল সেবন করেন, তাঁদের মাঝে মাইগ্রেনজনিত জটিলতা অনেক বেশি দেখা যায়।

তীব্রতা ও প্রধান প্রধান লক্ষণ:
মাইগ্রেনের ব্যথার ধরন সাধারণত মাঝারি থেকে অত্যন্ত জটিল বা তীব্র প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এই ব্যথা সাধারণত পুরো মাথায় একসঙ্গে শুরু হয় না, বরং মাথার যেকোনো একটি নির্দিষ্ট পাশে (ডানে কিংবা বামে) বেশি অনুভূত হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক ব্যবস্থা না নিলে বা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা স্থায়ী হলে তা ধীরে ধীরে পুরো মাথায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি সাধারণ মাইগ্রেন অ্যাটাক একটানা ৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে হয় মাথাটা যেন ছিঁড়ে বা ফেটে যাবে। এই তীব্র ব্যথার পাশাপাশি আরও কিছু কষ্টদায়ক উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে রোগীর বমি বমি ভাব হয় এবং অনেক সময় সরাসরি বমি হয়ে যায়। এই সময়ে রোগীর স্নায়ুগুলো এতটাই সংবেদনশীল হয়ে পড়ে যে তিনি তীব্র আলো এবং উচ্চ শব্দ বা কোলাহল একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আলোর দিকে তাকালে বা কোনো শব্দ শুনলে মাথার ভেতরের যন্ত্রণা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই কারণে মাইগ্রেনের রোগীরা ব্যথা শুরু হলে সাধারণত একটি অন্ধকার ঘরে, ঘরের সব আলো ও ফ্যান বা এসি বন্ধ করে সম্পূর্ণ শান্ত পরিবেশে শুয়ে থাকতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

যেসব অভ্যাস পরিহার করা জরুরি:
যাঁদের মাইগ্রেনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে, চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলতে পারলে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে অনেকটাই দূরে থাকা সম্ভব।

প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে পেট খালি রাখার অভ্যাস সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে মানুষের শরীরে গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। এই গ্যাস্ট্রিকের কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও শারীরিক অস্বস্তি সরাসরি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং মাইগ্রেনের ব্যথাকে মুহূর্তের মধ্যে উস্কে দেয়। তাই নির্দিষ্ট সময় পর পর পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ঘুমের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অনিয়ম করা যাবে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো কারণে নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে ৬ ঘণ্টা অবিচ্ছিন্ন ঘুমের প্রয়োজন। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা রাত জেগে ড্রামা বা ওয়েব সিরিজ দেখার যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তৃতীয়ত, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া বা কমিয়ে ফেলা দরকার। রক্তে শর্করার বা সুগারের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে তা শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট করে, যা মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই প্রক্রিয়াজাত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

চতুর্থত, আজকাল কাজের প্রয়োজনে অনেকেরই একটানা কম্পিউটারের বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন শেয়ারিং চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং মাইগ্রেনের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। তাই কাজের মাঝখানে অবশ্যই ছোট ছোট বিরতি নিতে হবে।

পঞ্চমত, শরীরে পানির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা বা ডিহাইড্রেশন রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গরমের দিনে আমাদের শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়ে যাওয়ার কারণে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এই পানিশূন্যতা মাইগ্রেন অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় সবসময় নিরাপদ খাবার পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। প্রতিদিন প্রচুর পানি পানের পাশাপাশি ডাবের পানি, তাজা ফলের খাঁটি রস কিংবা ছাতুর শরবতের মতো স্বাস্থ্যকর পানীয় পান করুন।

ষষ্ঠত, আমাদের দেশের চরম আবহাওয়া মাইগ্রেন বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত কড়া রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ছাতা ছাড়া ঘোরাঘুরি করলে রোদ ও গরমের কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা চট করে শুরু হতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার তারতম্য বা হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেও এই ব্যথার তীব্রতা বাড়তে পারে। তাই রোদে বের হলে অবশ্যই সানগ্লাস, ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার করা উচিত।

দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ:
মাইগ্রেনকে সাধারণ মাথাব্যথা ভেবে যদি কেউ অবহেলা করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সঠিক চিকিৎসা না করিয়ে এই যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন, তবে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেনের রোগীদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে তীব্র ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা এবং ক্রনিক অ্যানজাইটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। তাই এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ অনুসারে নিয়ম মেনে জীবনযাপন ও ওষুধ সেবন করতে হবে।

[সহকারী রেজিস্ট্রার, সিওমেক ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]