আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
রাজনৈতিক প্রভাব এবং লুটপাট করে ব্যাংকিং খাতকে অলমোস্ট খালি করে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। এটা আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন প্রোগ্রামের ৬৬ শতাংশ। আমরা জানি, প্রতি বছরই কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে (অফ দ্য পলিটিক্যাল রিজাইন) যখনই এডিপির বাজেট দেওয়া হয়, সেটা ইমপ্লিমেন্টেশনে হিমশিম খেতে হয়। ওই পরিমাণ অর্থ শুধু ব্যাংকিং সেক্টর থেকে লুটপাট হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন, আশা করি পৃথিবীর সবাই জানে। আজকে হয়তো আবার এসআলম গ্রুপ থেকে ফোন পেতে পারি। এস আলম গ্রুপ লুট করেছে ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা। এই ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা টোটাল এডিবির গভর্মেন্ট আগামী বাজেটে যে পরিমাণ খরচ করতে চায় এক্সাক্টলি সেই পরিমাণটা।
সম্প্রতি এক উচ্চ পর্যায়ের সেমিনারে তিনি এই বিস্ফোরক তথ্য জানান। সেমিনারে তিনি বাংলাদেশের খাদে পড়া অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এস আলমের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। সেমিনারটিতে বাংলাদেশের রাজস্ব খাত সংস্কার এবং ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাজেটের সম্পর্ক এটার উপরে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার শিক্ষক ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, এবার চিন্তা করে দেখুন আমাদের টাকা কোথায় যাচ্ছে? কেন আমরা বাজেট ইমপ্লিমেন্ট করতে হিমশিম খাই। দুঃখজনক বিষয়। আবারও বলছি এর আগের দিনও বলেছিলাম বর্তমান গভমেন্ট ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ করে আবার এই ব্যাংক লুটেরাদের আবার ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার এই সুযোগ করে দিয়েছে। সেন্ট্রাল ব্যাংকিং পৃথিবীর যেকোন দেশের জন্য একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেকোন অর্থনীতির জন্য। কিন্তু আপনারা জানেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায় ৮১ মিলিয়ন ডলার। যেটা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তৈরি করেছিল। আমরা আশা করেছিলাম আবার বর্তমান সরকার এই বাংলাদেশ ব্যাংক এটাকে আবার সচল করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমার ধারণা শুধু বাংলাদেশে না সারা পৃথিবীতে রেকর্ড করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমএ পাস একাউন্ট্যান্টকে সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে। যেটা শুধু বাংলাদেশের না বিশ্ব রেকর্ড। তার সেন্ট্রাল ব্যাংকিং এ কোনো অভিজ্ঞতা নাই। এটা কেন করা হলো? প্রশ্ন হলো কেন এই নিয়োগ দেওয়া হলো? সব প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে একইভাবে এই নিয়োগও হয়েছে।
সুদানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর সালাম হাসান। যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করা। পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের গভর্নর। অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি করা। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের একাউন্ট্যান্ট হিসেবেও কোনো কাজ নাই।
খান জহিরুল ইসলাম বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি যেটা বলি আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রোগ্রাম সেটার সাইজ ধরা হয়েছে আনুমানিক ৩ লক্ষ কোটি টাকা। এই ৩ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে গভর্মেন্ট ফাইনান্স করার প্ল্যান করছে ১ লক্ষ ৯০০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লক্ষ ১০০ হাজার কোটি টাকা গভমেন্ট ঋণ করে ফাইনান্সিং করার প্ল্যান করছে।
অর্থ পাচারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আপনারা সবাই জানেন ২০০৯ থেকে ২০২৩ এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। আর বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ১২.৪ বিলিয়ন ডলার। যেটা একটা বাজেটের একটা বিশাল অংশ।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, শুধু বাংলাদেশ না পৃথিবীর যেকোনো দেশের ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কারণ হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের উপরে নির্ভর করে ইনভেস্টমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এমপ্লয়মেন্ট এই সবগুলো বিষয় ইনফ্লেশন মানিটারি পলিসি সবগুলো ব্যাংকিং সেক্টরের সঙ্গে রিলেটেড। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যাগুলো সবারই হয়তো জানা।
ভয়াবহ ঋণ খেলাপী নিয়ে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমাদের আগামী বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাইজ সচিব মহোদয় বলেছেন, ৯ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লক্ষ ৩০০০০ কোটি টাকা। একটা বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ আমাদের খেলাফি ঋণ আছে। আমি যেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, এই খেলাফি ঋণ যদি না থাকে তাহলে আমাদের বাজেটটা ইমপ্লিমেন্টেশনে কী ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারতো এবং এটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত।
‘সিপিডির গবেষক বলেছেন যে, আসলে ইমপ্লিমেন্টেশন করা যায় না। কারণ হচ্ছে আমাদের তো সেই পরিমাণ টাকা নেই। টাকা নেই কেন? কারণ হচ্ছে আমাদের টাকা পাচার হচ্ছে, চুরি হচ্ছে, খেলাপি হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ইফেক্টিভ জায়গা। বাজেটের ৭৫ শতাংশ যদি খেলাফি ঋণ থাকে আমি আশা করি সেই জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। এনসিপির সংসদ সদস্যরা এই জায়গায় কথা বলবেন। এই টাকাগুলো তো ছিল, সেটা নাই হয়ে গেছে আমাদের অর্থনীতি থেকে পাচার এবং দুর্নীতির জন্য।
‘এরপরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং লুটপাট করে ব্যাংকিং খাতকে অলমোস্ট খালি করে দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ১৭ বিলিয়ন ডলার শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হয়েছে। যেটা আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৬৬ শতাংশ। আমরা জানি প্রতিবছরই কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পলিটিক্যাল রিজাইন যখনই এডিপির বাজেট দেওয়া হয় সেটা ইমপ্লিমেন্টেশনে হিমসিম খেতে হয়। অথচ ৬৬ শতাংশ অফ দ্য এডিপি প্রোগ্রাম এটা শুধু ব্যাংকিং খাত। ওই পরিমাণ অর্থ শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুটপাট হয়েছে।’
এস আলমের দুর্নীতি নিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, এস আলম গ্রুপ লুট করেছে ১ লক্ষ ৯০০ হাজার কোটি টাকা। এই ১ লক্ষ ৯০০ হাজার কোটি টাকা মোট এডিবির গভমেন্ট আগামী বাজেটে যে পরিমাণ খরচ করতে চায় এক্সাক্টলি সেই পরিমাণটা।
‘আমাদের টাকা কোথায় যাচ্ছে কেন আমরা বাজেট ইমপ্লিমেন্ট করতে হিমশিম খাই। আবারও বলছি বর্তমান গভমেন্ট ব্যাংক ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ করে আবার এই ব্যাংক লুটেরাদের আবার ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার এই সুযোগ করে দিয়েছে। তাই সংসদ সদস্যদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে আপনারা যদি সংস্কার নিয়ে সংসদে কথা বলেন বাজেট আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের লুটপাট এবং বর্তমান সরকার আবারো এই লুটার এস আলমকে নিয়ে আসার জন্য সুযোগ করে দিচ্ছেন এটা নিয়ে কথা বলবেন। আপনারা যেটা বলে গেলেন যে ভোটে হয়তো এটা পাশ হয়ে যাবে। তারপরও আমরা দেখতে চাই আপনারা এটা নিয়ে জোরালো অবস্থান নিচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতের দ্বিতীয় দুর্বলতা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং পৃথিবীর যেকোন দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আপনারা জানেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায় ৮১ মিলিয়ন ডলার যেটা সারা পৃথিবীতে আলোরণ তৈরি করেছিল। ৮১ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হয়ে গেছে এবং আমরা জানি আমাদের এর সঙ্গে রথি-মহারথি সবাই জড়িত ছিল।’
তাহলে আমাদের ব্যাংকিং খাতে করণীয় কি? আমাদের আসলে আলফা জেনারেশন জেএনজির পরে যে আলফার জেনারেশন করণীয় আমরা সবাই জানি। আমার ধারণা বাংলাদেশের এরা এত সচেতন তারা জানে করণীয় কি? সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতি কীভাবে কমানো যাবে সেই বিষয়ে কনস্ট্রাক্টিভ আলোচনা আমরা দেখতে চাই এনসিপির সংসদ সদস্যসহ সব নেতাদের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরোপুরি স্বাধীন করতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। যেটা জুলাই সনদে ক্লিয়ারলি ছিল।
‘তো সেই সংস্কার তো রিজেক্ট করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ যেটা সেখানে ঢেলে সাজাতে হবে। এটা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















