আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
দেশে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস ও কসমেটিকসের মতো উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানিতে ধস নেমেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ওপর।
ফলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বিশাল রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে এই শুল্ক স্টেশন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থবছরের শুরুতে চট্টগ্রাম কাস্টমের জন্য এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জন হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। এখনো ঘাটতি ১৬ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মে ও জুন এই শেষ দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হলেও অর্থবছর শেষে কমপক্ষে ১৭ হাজার কোটি টাকার বড় ঘাটতি থেকে যাবে। এ নিয়ে টানা পাঁচ অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস।
চট্টগ্রাম কাস্টমের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও উচ্চ শুল্কের পণ্য না আসায় রাজস্বে এই বড় ধাক্কা লেগেছে। কাস্টমসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, বছরজুড়ে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানিতে এলসি (ঋণপত্র) খোলায় কড়াকড়ি ছিল।
বিশেষ করে যেসব পণ্য থেকে বেশি রাজস্ব আসে, সেগুলোর আমদানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্কহার শূন্য বা ফ্রি করায় কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসেনি।
শুল্ক স্টেশনটির কর্মকর্তারা জানান, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি থেকে কাস্টম সবচেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব পেয়ে থাকে, যেখানে শুল্কের হার ৩০০ থেকে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। ডলার সাশ্রয়ে সরকারের কড়াকড়ি এবং ব্যাংকগুলোর এলসি বন্ধ রাখার কারণে চলতি অর্থবছর গাড়ি ও দামি ইলেকট্রনিকস পণ্যের আমদানি প্রায় তলানিতে নেমেছে।
এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানির পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।ওজনের হিসাবে পণ্য এসেছে আগের চেয়ে প্রায় এক কোটি টন বেশি। কিন্তু এই বাড়তি পণ্যের বেশির ভাগই ছিল চাল, ডাল, তেল, চিনি ও সার, যার বড় অংশই শুল্কমুক্ত কিংবা নামমাত্র শুল্কের পণ্য। ফলে খালাস হওয়া পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও কাস্টমের কোষাগারে আশানুরূপ টাকা জমা হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি রিগ্যান বলেন, গত দেড় বছর ধরেই আমদানির গতি শ্লথ। দেশের অন্তত সাত-আটটি ব্যাংক তীব্র তারল্য ও ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলাই বন্ধ রেখেছিল। এর ওপর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার প্রভাব বাজারে পড়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ভেতরেও সব ধরনের পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির ঝুঁকি নিচ্ছেন না। তিনি আরো যোগ করেন, দেশের অভ্যন্তরে সামগ্রিকভাবে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেছে এবং গাড়ি বা বিলাসবহুল ইলেকট্রনিকসের মতো উচ্চশুল্কের পণ্য আমদানিতে ধস নেমেছে।
রাজস্ব আয়ের ট্রেন্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। কেবল সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্যমাত্রার কিছুটা কাছাকাছি (সাত হাজার কোটি টাকা) আদায় হয়েছিল। আর সবচেয়ে বড় ব্যবধান ছিল ডিসেম্বর মাসে, সেবার লক্ষ্য থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা কম আয় হয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আগের অর্থবছরের ১০ মাসের তুলনায় এবার রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম কাস্টম। টাকার অঙ্কে যা আগের বছরের চেয়ে চার হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা বেশি।
দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং কনটেইনারবাহী পণ্যের ৯৮ শতাংশ পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















