ঢাকা ১১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৈরি পোশাকের মূল্য সংযোজনে কঠিন শর্ত আরোপ হচ্ছে

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর মূল্য সংযোজনের শর্ত কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে কাঁচামাল আমদানি করে শিশুদের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ ভ্যালু এডিশন বা মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। নতুন আমদানি নীতি আদেশে যা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর খসড়ায় এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়া নীতি চূড়ান্ত করতে আজ বৃহস্পতিবার স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। নতুন নীতি কার্যকর হলে তা ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। খসড়া নীতিতে ‘নিট ফেব্রিক্স আমদানি করা যাবে না’– এমন প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন নিটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তারা।

বর্তমান আমদানি নীতিতে নিট, ওভেন ও শিশু পোশাক ছাড়া অন্য কোনো পণ্য রপ্তানিতে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে নতুন নীতিতে অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্য, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ এবং ফার্নিচার রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম ভ্যালু এডিশনের শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল্য সংযোজন বলতে বোঝায়, তৈরি পণ্যের মোট মূল্যের কতটুকু বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়, তার হার।

খসড়া অনুযায়ী, অন্তর্বাস ও অন্যান্য সিনথেটিক ফাইবারের বিশেষায়িত পোশাক রপ্তানিতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতা রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ, জাহাজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ এবং কাঠের তৈরি ফার্নিচার রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত থাকতে পারে।

এ বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কিছু নিটওয়্যার রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব হলেও বর্তমানে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। শিশু পোশাক এবং অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্যে প্রস্তাবিত মূল্য সংযোজন হার কারখানা ও ব্র্যান্ডভেদে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবের সমালোচনা করে মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশে উৎপাদিত হয় না– এমন নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। তা না হলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, উচ্চ মূল্যের নিট পোশাকের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব নয়। এ ধরনের ফেব্রিক্সের একটা বাড় অংশ এখনও আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে হলে ডাইং খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সংকট রয়েছে এবং বিনিয়োগের পরিবেশও অনুকূলে নয়। ফলে উচ্চমূল্যের নিটওয়্যার রপ্তানির মাধ্যমে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হলে নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখতে হবে।

আরও যা আছে:
খসড়া নীতিতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, মোটরকার, প্যাসেঞ্জার কার ও ট্রাক আমদানির নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের পুরোনো বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া আগের বছরের রপ্তানি আয়ের ভিত্তিতে আমদানির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, ওভেন ও শিশু পোশাক খাতে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রয়েছে। এটি অপরিবর্তিত রাখা হলেও ম্যান-মেইড ফাইবার, অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবার পণ্যের ক্ষেত্রে এ সীমা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব
করা হয়েছে।

জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতার ক্ষেত্রে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। জাহাজ শিল্পে রপ্তানি এলসির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে। কাঠের ফার্নিচারের ক্ষেত্রে আগের বছরের আমদানির তুলনায় ৪০ শতাংশ, ফেব্রিক্স ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশভিত্তিক ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া আমদানি নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত শুল্কে পণ্য আমদানির সুযোগের বিষয়টি সার্টিফিকেট অব অরিজিনের আওতায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান নীতিতে ইসরায়েলি পণ্য আমদানিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নতুন খসড়ায় তা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল থেকে বা সেখানে উৎপাদিত কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। একই সঙ্গে ইসরায়েলের পতাকাবাহী জাহাজেও কোনো পণ্য আনা যাবে না।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তৈরি পোশাকের মূল্য সংযোজনে কঠিন শর্ত আরোপ হচ্ছে

আপডেট সময় ০৪:২০:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর মূল্য সংযোজনের শর্ত কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে কাঁচামাল আমদানি করে শিশুদের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ ভ্যালু এডিশন বা মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। নতুন আমদানি নীতি আদেশে যা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর খসড়ায় এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়া নীতি চূড়ান্ত করতে আজ বৃহস্পতিবার স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। নতুন নীতি কার্যকর হলে তা ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। খসড়া নীতিতে ‘নিট ফেব্রিক্স আমদানি করা যাবে না’– এমন প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন নিটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তারা।

বর্তমান আমদানি নীতিতে নিট, ওভেন ও শিশু পোশাক ছাড়া অন্য কোনো পণ্য রপ্তানিতে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে নতুন নীতিতে অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্য, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ এবং ফার্নিচার রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম ভ্যালু এডিশনের শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল্য সংযোজন বলতে বোঝায়, তৈরি পণ্যের মোট মূল্যের কতটুকু বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়, তার হার।

খসড়া অনুযায়ী, অন্তর্বাস ও অন্যান্য সিনথেটিক ফাইবারের বিশেষায়িত পোশাক রপ্তানিতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতা রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ, জাহাজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ এবং কাঠের তৈরি ফার্নিচার রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত থাকতে পারে।

এ বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কিছু নিটওয়্যার রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব হলেও বর্তমানে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। শিশু পোশাক এবং অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্যে প্রস্তাবিত মূল্য সংযোজন হার কারখানা ও ব্র্যান্ডভেদে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবের সমালোচনা করে মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশে উৎপাদিত হয় না– এমন নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। তা না হলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, উচ্চ মূল্যের নিট পোশাকের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব নয়। এ ধরনের ফেব্রিক্সের একটা বাড় অংশ এখনও আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে হলে ডাইং খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সংকট রয়েছে এবং বিনিয়োগের পরিবেশও অনুকূলে নয়। ফলে উচ্চমূল্যের নিটওয়্যার রপ্তানির মাধ্যমে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হলে নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখতে হবে।

আরও যা আছে:
খসড়া নীতিতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, মোটরকার, প্যাসেঞ্জার কার ও ট্রাক আমদানির নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের পুরোনো বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া আগের বছরের রপ্তানি আয়ের ভিত্তিতে আমদানির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, ওভেন ও শিশু পোশাক খাতে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রয়েছে। এটি অপরিবর্তিত রাখা হলেও ম্যান-মেইড ফাইবার, অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবার পণ্যের ক্ষেত্রে এ সীমা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব
করা হয়েছে।

জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতার ক্ষেত্রে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। জাহাজ শিল্পে রপ্তানি এলসির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে। কাঠের ফার্নিচারের ক্ষেত্রে আগের বছরের আমদানির তুলনায় ৪০ শতাংশ, ফেব্রিক্স ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশভিত্তিক ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া আমদানি নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত শুল্কে পণ্য আমদানির সুযোগের বিষয়টি সার্টিফিকেট অব অরিজিনের আওতায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান নীতিতে ইসরায়েলি পণ্য আমদানিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নতুন খসড়ায় তা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল থেকে বা সেখানে উৎপাদিত কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। একই সঙ্গে ইসরায়েলের পতাকাবাহী জাহাজেও কোনো পণ্য আনা যাবে না।