ঢাকা ০১:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পূর্বের তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত: পঙ্কজ শরণ

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক এখন আরও সমৃদ্ধ হবে। দু’দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তিক্ত ও স্থবির হয়ে ওঠে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এমন শ্লোগানের মধ্য দিয়ে জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে এবার ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সময় পূর্বের সেই তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বর্তমানে একটি নতুন দিক হলো শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) নয়াদিল্লিতে সুষমা স্বরাজ ভবনে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এসব কথা বলেন। তিনি বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ন্যাটস্ট্র্যাটের উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জিও বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশস্থ ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, তখন দুই দেশের সম্পর্ক বড় আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে।’

পঙ্কজ শরণ বলেন, সংসদীয় নির্বাচনের জয়ের পর পরই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে, ফলাফলকে স্বাগত জানাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক মুহূর্ত সময় অপেক্ষা করেননি। তিনি ফোন করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন। বিএনপিও বার্তা দিয়ে প্রাপ্তি স্বীকার করেছে।

সফরত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালটি মনে করেন, তখন দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় ভেঙে পড়েছিল। কারণ ছিল ভারতের উদ্বেগ, বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল বলে তারা মনে করত। বাংলাদেশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ফলে দুই দেশ কার্যত অচলাবস্থায় পড়ে যায়।’

পঙ্কজ শরণ বলেন, তখন কোনো আলোচনা হচ্ছিল না। ভারত কিছু বলত, বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করত—এটাই ছিল পুরো আলোচনা। এর ফলাফল ছিল খুবই নেতিবাচক। মানুষ ভুগেছে, সবাই ভুগেছে এবং আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগ এগোতে পারেনি।

ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এমন ধারণাও ছিল। অপরদিকে এমনও একটি ধারণা ছিল যে, ভারত শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে এবং পুরো রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নয়। ফলে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি—এই দুইয়ের মিশ্রণ সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের নতুন সরকার কীভাবে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে এবং এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান কী হবে।’ ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালের সমস্যাগুলোর বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন ভুল ছিল না। তারা মনে করে, সেটি একটি খারাপ সময় ছিল এবং সে সময় অনেক কিছু ঘটেছিল, যা ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছিল। এই অবস্থান এখনো তাদের রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে তারা নতুন করে ভাবতে বা বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত নয়। পঙ্কজ শরণ শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের উদাহরণ দেন। ওই দেশগুলোর সরকারগুলো ভারতবিরোধী এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এখন তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো।

বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার অভিযোগকে অপপ্রচার ও অতিরঞ্জিত ভাবনা বলে মন্তব্য করেন পঙ্কজ শরণ। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেরই গোয়েন্দা কার্যক্রম আছে। বাংলাদেশ ভারতের গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচারটি ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর, এমনকি পাকিস্তান, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রেরও হতে পারে।

এদিকে ভারতের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো রাজনীতিককে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পঙ্কজ শরণ বলেন, নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের সিদ্ধান্তটি চমৎকার। নতুন হাইকমিশনার ভারতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, অভিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশের শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য বিষয় ভালো বোঝেন। তিনি সবচেয়ে কঠিন সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন বলে আশাবাদী পঙ্কজ শরণ।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক বছর পর এবার এমন পরিস্থিতি আসছে, যখন ভারতের কেন্দ্রে ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই দলের সরকার থাকবে। বিজেপি সরকার নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। তারা পশ্চিমবঙ্গে মাফিয়া, অপরাধীদের শক্ত হাতে দমন করবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় তিস্তা নদীতে একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়।’ তবে, এ ব্যাপারে সংবেদনশীলতা যে আছে, সে বিষয়ে পুরোপুরি জানার পরও যদি আপনারা (বাংলাদেশ) এগোতে চান, তবে এটি আপনাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশকে থামাতে পারে না। ভারত শুধু বলতে পারে, দেখুন, এটি আমাদের উদ্বেগের বিষয়। কারণ এটি বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী।

পঙ্কজ শরণ বলেন, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি, পানিবণ্টন নিয়ে তিনি কোনো নেতিবাচক মন্তব্য শোনেননি। ৪০ বছরের পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ওই চুক্তিতে পানিবণ্টনের ফর্মুলা ঠিক করা হয়েছিল। এবার নতুন চুক্তির জন্য আলোচনায় পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।

সীমান্তে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয় উল্লেখ করে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, প্রতিটি ঘটনার আড়ালে অন্য গল্প থাকে। এই সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, প্রটোকলগুলো মেনে চলা প্রয়োজন। তিনি যোগ করেন, আমরা সেই পুরনো অতীতে ফিরে যেতে পারি না, যখন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো পরস্পরকে সন্দেহ করত। আর সন্দেহ করার চর্চায় সমস্যার সমাধান আসবে না।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘এটা এক ধরনের ‘আয়রনি’। এখানে কিছুটা রাজনীতি আছে, কিছুটা আইনি বিষয়ও আছে। বর্তমানে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল এবং আমাদের দেখতে হবে দুই সরকার কীভাবে এটি পরিচালনা করে। তবে সত্যি বলতে, অতীতেও অনেক নেতা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য বিদেশে বসবাস করেছেন। এটি প্রথম ঘটনা নয়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পূর্বের তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত: পঙ্কজ শরণ

আপডেট সময় ১১:৪৮:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক এখন আরও সমৃদ্ধ হবে। দু’দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তিক্ত ও স্থবির হয়ে ওঠে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এমন শ্লোগানের মধ্য দিয়ে জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে এবার ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সময় পূর্বের সেই তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বর্তমানে একটি নতুন দিক হলো শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) নয়াদিল্লিতে সুষমা স্বরাজ ভবনে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এসব কথা বলেন। তিনি বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ন্যাটস্ট্র্যাটের উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জিও বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশস্থ ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, তখন দুই দেশের সম্পর্ক বড় আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে।’

পঙ্কজ শরণ বলেন, সংসদীয় নির্বাচনের জয়ের পর পরই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে, ফলাফলকে স্বাগত জানাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক মুহূর্ত সময় অপেক্ষা করেননি। তিনি ফোন করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন। বিএনপিও বার্তা দিয়ে প্রাপ্তি স্বীকার করেছে।

সফরত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালটি মনে করেন, তখন দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় ভেঙে পড়েছিল। কারণ ছিল ভারতের উদ্বেগ, বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল বলে তারা মনে করত। বাংলাদেশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ফলে দুই দেশ কার্যত অচলাবস্থায় পড়ে যায়।’

পঙ্কজ শরণ বলেন, তখন কোনো আলোচনা হচ্ছিল না। ভারত কিছু বলত, বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করত—এটাই ছিল পুরো আলোচনা। এর ফলাফল ছিল খুবই নেতিবাচক। মানুষ ভুগেছে, সবাই ভুগেছে এবং আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগ এগোতে পারেনি।

ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এমন ধারণাও ছিল। অপরদিকে এমনও একটি ধারণা ছিল যে, ভারত শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে এবং পুরো রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নয়। ফলে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি—এই দুইয়ের মিশ্রণ সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের নতুন সরকার কীভাবে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে এবং এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান কী হবে।’ ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালের সমস্যাগুলোর বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন ভুল ছিল না। তারা মনে করে, সেটি একটি খারাপ সময় ছিল এবং সে সময় অনেক কিছু ঘটেছিল, যা ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছিল। এই অবস্থান এখনো তাদের রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে তারা নতুন করে ভাবতে বা বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত নয়। পঙ্কজ শরণ শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের উদাহরণ দেন। ওই দেশগুলোর সরকারগুলো ভারতবিরোধী এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এখন তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো।

বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার অভিযোগকে অপপ্রচার ও অতিরঞ্জিত ভাবনা বলে মন্তব্য করেন পঙ্কজ শরণ। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেরই গোয়েন্দা কার্যক্রম আছে। বাংলাদেশ ভারতের গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচারটি ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর, এমনকি পাকিস্তান, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রেরও হতে পারে।

এদিকে ভারতের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো রাজনীতিককে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পঙ্কজ শরণ বলেন, নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের সিদ্ধান্তটি চমৎকার। নতুন হাইকমিশনার ভারতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, অভিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশের শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য বিষয় ভালো বোঝেন। তিনি সবচেয়ে কঠিন সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন বলে আশাবাদী পঙ্কজ শরণ।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক বছর পর এবার এমন পরিস্থিতি আসছে, যখন ভারতের কেন্দ্রে ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই দলের সরকার থাকবে। বিজেপি সরকার নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। তারা পশ্চিমবঙ্গে মাফিয়া, অপরাধীদের শক্ত হাতে দমন করবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় তিস্তা নদীতে একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়।’ তবে, এ ব্যাপারে সংবেদনশীলতা যে আছে, সে বিষয়ে পুরোপুরি জানার পরও যদি আপনারা (বাংলাদেশ) এগোতে চান, তবে এটি আপনাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশকে থামাতে পারে না। ভারত শুধু বলতে পারে, দেখুন, এটি আমাদের উদ্বেগের বিষয়। কারণ এটি বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী।

পঙ্কজ শরণ বলেন, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি, পানিবণ্টন নিয়ে তিনি কোনো নেতিবাচক মন্তব্য শোনেননি। ৪০ বছরের পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ওই চুক্তিতে পানিবণ্টনের ফর্মুলা ঠিক করা হয়েছিল। এবার নতুন চুক্তির জন্য আলোচনায় পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।

সীমান্তে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয় উল্লেখ করে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, প্রতিটি ঘটনার আড়ালে অন্য গল্প থাকে। এই সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, প্রটোকলগুলো মেনে চলা প্রয়োজন। তিনি যোগ করেন, আমরা সেই পুরনো অতীতে ফিরে যেতে পারি না, যখন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো পরস্পরকে সন্দেহ করত। আর সন্দেহ করার চর্চায় সমস্যার সমাধান আসবে না।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘এটা এক ধরনের ‘আয়রনি’। এখানে কিছুটা রাজনীতি আছে, কিছুটা আইনি বিষয়ও আছে। বর্তমানে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল এবং আমাদের দেখতে হবে দুই সরকার কীভাবে এটি পরিচালনা করে। তবে সত্যি বলতে, অতীতেও অনেক নেতা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য বিদেশে বসবাস করেছেন। এটি প্রথম ঘটনা নয়।