ঢাকা ০১:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘মৌলিক জ্ঞান না থাকলে কোচিংয়ে আসা উচিত নয়’:তামিম ইকবাল আপসকামিতা নয়, স্বৈরাচারকে প্রতিহত করার ইতিহাস বিএনপির: জাহিদ হোসেন পটিয়া থানার ২শ গজ সামনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল হবিগঞ্জে হামলার ঘটনায় ১১ জনের নামে এনসিপির মামলা বর্তমান সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো দুর্নীতি গুম খুন হয়নি হবিগঞ্জে গিয়ে মামলা না করে আমরা ফিরব না: এমপি হাসনাত যুব জামায়াত নেতার কাণ্ড; বিধবা নারীকে ধর্ষণের পর গর্ভপাতের অভিযোগ:দল থেকে সদস্যপদ স্থগিত মানবতার মুক্তিতে ইসলামের আদর্শের বিজয়ের বিকল্প নেই: চরমোনাই পীর সব প্রকল্পের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য:জহির উদ্দিন স্বপন হঠাৎ ৬ মুসলিম দেশের যৌথ সামরিক মহড়া, কী বার্তা দিচ্ছে

উত্তপ্ত পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর, লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে নির্বাচন বয়কটের ডাক দেওয়া স্থানীয়দের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তাক্ত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোট শহরে জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।

এদিকে, মিরপুরে বুধবার বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। শহরের অধিকাংশ দোকানপাট ও মার্কেট বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে, অঞ্চলটির বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ সংযোগ ব্যবহার করতে সমস্যার মুখে পড়ছেন।

কাশ্মীরের কর্মকর্তাদের দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সশস্ত্র সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তীব্র গোলাগুলি চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির দাবি, রাওয়ালাকোট ও মিরপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তাদের ১৭ সদস্য নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, গত দুই দিনের সশস্ত্র সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন।

তবে হতাহতদের সংখ্যা নিয়ে উভয় পক্ষের দেওয়া তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বিবিসি।

রাওয়ালাকোট জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শহরের দারিক এলাকায় জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির বিপুলসংখ্যক কর্মী অবস্থান করছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তবে বাস টার্মিনালের দিক থেকে এগিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য করেছে বলে তিনি জানান।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তার দাবি, দারিক এলাকার কাছে চারটি নির্মাণাধীন ভবনে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সশস্ত্র সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। সেখান থেকেই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে টানা গুলি চালাচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৪৮ ঘণ্টার সংঘর্ষে রেঞ্জার্সের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও চার সদস্য আহত হয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, প্রশাসনের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দারিক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। তবে তিনি হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।

অন্যদিকে, জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির কোর কমিটির সদস্য আবিদ শাহীন দাবি করেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় শুধু রাওয়ালাকোটের দারিক এলাকাতেই গোলাগুলিতে তাদের ১১ কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া মিরপুরে আগের দিন পুলিশের গুলিতে আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে তার দাবি।

তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির নেতা আবিদ শাহীন বলেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে লংমার্চ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।

এদিকে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে মোবাইল ফোনে কথা বলার সেবা চালু থাকলেও মিরপুর ছাড়া প্রায় সব এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে।

মিরপুরের বাসিন্দা ফয়জান বলেন, শুধু ল্যান্ডলাইনভিত্তিক ইন্টারনেট সংযোগ চালু আছে। তবে সেটিও স্থিতিশীল নয়। আর মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট একেবারেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

কাশ্মীর ও পাকিস্তান প্রশাসন যা বলছে:

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী ফয়সাল মুমতাজ রাঠোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরা আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনের সময় মুজাফফরাবাদের দিকে লংমার্চের পরিকল্পনা করেছিল। তার ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য ছিল ‘বৃহৎ পরিসরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা’।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা ‘আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত’ এবং তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

এর আগে মঙ্গলবার পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের তথ্যসচিব মোহাম্মদ রাশিদ হানিফ এবং কাশ্মীর পুলিশের মুখপাত্র ডিআইজি ইরফান মাসুদ কাশফি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ‘সশস্ত্র জঙ্গিও’ চলমান পরিস্থিতিতে জড়িত রয়েছে। তারা বলেন, এসব তৎপরতার ওপর রাষ্ট্র নিবিড় নজর রাখছে।

এ ঘটনায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

আজাদ কাশ্মীরকে আরও সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব বিলাওয়াল ভুট্টোর:
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা উল্লাহ তারার দাবি করেন, কিছু গোষ্ঠী ‘সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে’।

তিনি বলেন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার ও প্রশাসন আগেই জনগণকে সতর্ক করেছে, যাতে তারা ‘এ ধরনের সহিংস গোষ্ঠী থেকে দূরে থাকে’।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ জিও নিউজকে বলেন, ‘যারা বিক্ষোভ করছে, তারা এ ধরনের সংগঠনের সদস্য। তাদের কাছে অস্ত্র রয়েছে এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই।’

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদের, তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি বিলাওয়ালের

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং তেহরিক তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান-এর প্রধান মাহমুদ খান আচাকজাই পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে জম্মু ও কাশ্মীর আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, কাশ্মীরিদের ওপর চালানো এসব ‘নির্যাতনের’ বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জনগণের তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোয়েটায় এক সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান আচাকজাই দাবি করেন, তেহরিক তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান এবং মাওলানা ফজলুর রহমান কাশ্মীরের পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাদের সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, কাশ্মীরিদের ওপর কথিত নির্যাতন বন্ধে পাকিস্তানের জনগণের উচিত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে চলমান উত্তেজনা নিরসনে ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

মুজাফফরাবাদের কাছে পাট্টিকা তহসিলে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, তাদের দল এমনটি বলছে না যে বিক্ষোভকারীদের সব দাবি মেনে নিতে হবে। তবে সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যপন্থার সমাধান খুঁজে বের করা উচিত ছিল।

বিলাওয়ালের ভাষ্য, তার কাছে এমন একটি সমাধানের প্রস্তাব ছিল, যাতে রাষ্ট্রকে পিছু হটতে হতো না, আবার কোনো পক্ষের দাবিও তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।

তিনি বলেন, উভয় পক্ষ যদি ওই কমিশন মেনে নিত, তাহলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচি স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো যেত। তার দাবি, এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেক মূল্যবান প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।

বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে তা আইনের আওতায় নেওয়া উচিত। তবে কাউকে রাস্তায় এভাবে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর বলেন, তার দল কাশ্মীরের নির্বাচন বর্জনের সময়ই বলেছিল, আগে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই দেশ এগিয়ে যাবে।

তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল) রাজনৈতিক স্বার্থে পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

তার মতে, বর্তমান সংকটে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা পয়েন্ট স্কোরিংয়ের পরিবর্তে সমাধান খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত।

কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি চরম অব্যবস্থাপনার স্পষ্ট উদাহরণ’:

মানবাধিকার সংগঠনগুলো পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা ঘটনাগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ইজাবেল ল্যাসি বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগের ‘তাৎক্ষণিক, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত’ শুরু করা উচিত।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ থাকায় সেখানকার বাস্তব পরিস্থিতি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, আমরা পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন অবিলম্বে যোগাযোগসেবা পুনরুদ্ধার করে এবং গণমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের ওই এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়।

পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনও (এইচআরসিপি) পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের আইনসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের সময় রাওয়ালাকোটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এক বিবৃতিতে কমিশন বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব পালনের নামে মানুষের জীবনের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এইচআরসিপি ঘটনাটির স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিক্ষোভ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে পাকিস্তান:
কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে তৈরি হওয়া বর্তমান সংকট মূলত প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার ফল।

পাকিস্তানের সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক তালাত হুসেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল শাসনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মূল সংকট থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি অদূরদর্শী প্রচেষ্টা।

তালাত হুসেইনের মতে, তথ্যপ্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, এতটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।

সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিশ্লেষক মুশাহিদ হুসেইন সাইয়্যেদ বলেন, ভুল নীতি, ভুল কৌশল ও ভুল চিন্তার কারণে একের পর এক গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার মতে, এর ফলে শুধু জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জনের প্রচেষ্টাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানও দুর্বল হবে।

সাংবাদিক জিরার খোরোর মতে, পরিস্থিতি এখন ‘পূর্ণাঙ্গ সংকটে’ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ প্রয়োজন, প্রচলিত রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নয়, যার সঙ্গে মানুষ আগে থেকেই পরিচিত।

অন্যদিকে সাংবাদিক রেজা রুমি বলেন, চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সংলাপ ও আলোচনা।

ভারতে পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার আবদুল বাসিতের মতে, কাশ্মীরের নির্বাচন কয়েক মাসের জন্য স্থগিত রাখা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, যারা সত্যিই বিশ্বাস করেন—‘আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তান আমাদের’ তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ চলছে?

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি কাশ্মীর আইনসভায় কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবিতে গত ৯ জুন থেকে অঞ্চলজুড়ে বিক্ষোভ ও লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে।

৫৩ সদস্যের কাশ্মীর আইনসভায় এই ১২টি সংরক্ষিত আসন দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। আইনসভার ৩৩ জন সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নারী ও অন্যান্য শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরও আটটি সংরক্ষিত আসন রয়েছে।

১৯৭০-এর দশকে কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত এসব আসন চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে আসা এবং কাশ্মীর সংকটের সমাধানের পর নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার আশায় বসবাসকারী মানুষদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া।

তবে যাদের জন্য এসব আসন সংরক্ষিত, তাদের অনেকেই বর্তমানে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বসবাস করেন না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা কার্যত এসব আসনে নির্বাচন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির দাবি, কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করতে হবে। সংগঠনটির মতে, এসব আসনের কারণে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হচ্ছে।

তাদের দাবি, আইনসভার সব আসনই এমন ব্যক্তিদের জন্য হওয়া উচিত, যারা প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বসবাস করেন।

অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। তাদের মতে, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় এবং নির্ধারিত সময়েই পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচনের আগে বিক্ষোভ প্রত্যাহারের লক্ষ্যে সরকার জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা মুজাফফরাবাদের দিকে লংমার্চের ডাক দেন।

এদিকে, কাশ্মীর আইনসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট সোমবার মিরপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট হবে ২ আগস্ট মুজাফফরাবাদে এবং শেষ ধাপে ১০ আগস্ট পুঞ্চ বিভাগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তপ্ত পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর, লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

আপডেট সময় ০৯:৪০:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে নির্বাচন বয়কটের ডাক দেওয়া স্থানীয়দের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তাক্ত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোট শহরে জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।

এদিকে, মিরপুরে বুধবার বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। শহরের অধিকাংশ দোকানপাট ও মার্কেট বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে, অঞ্চলটির বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ সংযোগ ব্যবহার করতে সমস্যার মুখে পড়ছেন।

কাশ্মীরের কর্মকর্তাদের দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সশস্ত্র সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তীব্র গোলাগুলি চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির দাবি, রাওয়ালাকোট ও মিরপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তাদের ১৭ সদস্য নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, গত দুই দিনের সশস্ত্র সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন।

তবে হতাহতদের সংখ্যা নিয়ে উভয় পক্ষের দেওয়া তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বিবিসি।

রাওয়ালাকোট জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শহরের দারিক এলাকায় জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির বিপুলসংখ্যক কর্মী অবস্থান করছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তবে বাস টার্মিনালের দিক থেকে এগিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য করেছে বলে তিনি জানান।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তার দাবি, দারিক এলাকার কাছে চারটি নির্মাণাধীন ভবনে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সশস্ত্র সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। সেখান থেকেই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে টানা গুলি চালাচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৪৮ ঘণ্টার সংঘর্ষে রেঞ্জার্সের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও চার সদস্য আহত হয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, প্রশাসনের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দারিক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। তবে তিনি হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।

অন্যদিকে, জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির কোর কমিটির সদস্য আবিদ শাহীন দাবি করেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় শুধু রাওয়ালাকোটের দারিক এলাকাতেই গোলাগুলিতে তাদের ১১ কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া মিরপুরে আগের দিন পুলিশের গুলিতে আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে তার দাবি।

তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির নেতা আবিদ শাহীন বলেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে লংমার্চ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।

এদিকে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে মোবাইল ফোনে কথা বলার সেবা চালু থাকলেও মিরপুর ছাড়া প্রায় সব এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে।

মিরপুরের বাসিন্দা ফয়জান বলেন, শুধু ল্যান্ডলাইনভিত্তিক ইন্টারনেট সংযোগ চালু আছে। তবে সেটিও স্থিতিশীল নয়। আর মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট একেবারেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

কাশ্মীর ও পাকিস্তান প্রশাসন যা বলছে:

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী ফয়সাল মুমতাজ রাঠোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরা আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনের সময় মুজাফফরাবাদের দিকে লংমার্চের পরিকল্পনা করেছিল। তার ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য ছিল ‘বৃহৎ পরিসরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা’।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা ‘আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত’ এবং তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

এর আগে মঙ্গলবার পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের তথ্যসচিব মোহাম্মদ রাশিদ হানিফ এবং কাশ্মীর পুলিশের মুখপাত্র ডিআইজি ইরফান মাসুদ কাশফি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ‘সশস্ত্র জঙ্গিও’ চলমান পরিস্থিতিতে জড়িত রয়েছে। তারা বলেন, এসব তৎপরতার ওপর রাষ্ট্র নিবিড় নজর রাখছে।

এ ঘটনায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

আজাদ কাশ্মীরকে আরও সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব বিলাওয়াল ভুট্টোর:
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা উল্লাহ তারার দাবি করেন, কিছু গোষ্ঠী ‘সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে’।

তিনি বলেন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার ও প্রশাসন আগেই জনগণকে সতর্ক করেছে, যাতে তারা ‘এ ধরনের সহিংস গোষ্ঠী থেকে দূরে থাকে’।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ জিও নিউজকে বলেন, ‘যারা বিক্ষোভ করছে, তারা এ ধরনের সংগঠনের সদস্য। তাদের কাছে অস্ত্র রয়েছে এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই।’

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদের, তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি বিলাওয়ালের

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং তেহরিক তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান-এর প্রধান মাহমুদ খান আচাকজাই পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে জম্মু ও কাশ্মীর আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, কাশ্মীরিদের ওপর চালানো এসব ‘নির্যাতনের’ বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জনগণের তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোয়েটায় এক সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান আচাকজাই দাবি করেন, তেহরিক তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান এবং মাওলানা ফজলুর রহমান কাশ্মীরের পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাদের সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, কাশ্মীরিদের ওপর কথিত নির্যাতন বন্ধে পাকিস্তানের জনগণের উচিত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে চলমান উত্তেজনা নিরসনে ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

মুজাফফরাবাদের কাছে পাট্টিকা তহসিলে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, তাদের দল এমনটি বলছে না যে বিক্ষোভকারীদের সব দাবি মেনে নিতে হবে। তবে সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যপন্থার সমাধান খুঁজে বের করা উচিত ছিল।

বিলাওয়ালের ভাষ্য, তার কাছে এমন একটি সমাধানের প্রস্তাব ছিল, যাতে রাষ্ট্রকে পিছু হটতে হতো না, আবার কোনো পক্ষের দাবিও তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।

তিনি বলেন, উভয় পক্ষ যদি ওই কমিশন মেনে নিত, তাহলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচি স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো যেত। তার দাবি, এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেক মূল্যবান প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।

বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে তা আইনের আওতায় নেওয়া উচিত। তবে কাউকে রাস্তায় এভাবে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর বলেন, তার দল কাশ্মীরের নির্বাচন বর্জনের সময়ই বলেছিল, আগে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই দেশ এগিয়ে যাবে।

তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল) রাজনৈতিক স্বার্থে পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

তার মতে, বর্তমান সংকটে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা পয়েন্ট স্কোরিংয়ের পরিবর্তে সমাধান খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত।

কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি চরম অব্যবস্থাপনার স্পষ্ট উদাহরণ’:

মানবাধিকার সংগঠনগুলো পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা ঘটনাগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ইজাবেল ল্যাসি বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগের ‘তাৎক্ষণিক, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত’ শুরু করা উচিত।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ থাকায় সেখানকার বাস্তব পরিস্থিতি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, আমরা পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন অবিলম্বে যোগাযোগসেবা পুনরুদ্ধার করে এবং গণমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের ওই এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়।

পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনও (এইচআরসিপি) পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের আইনসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের সময় রাওয়ালাকোটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এক বিবৃতিতে কমিশন বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব পালনের নামে মানুষের জীবনের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এইচআরসিপি ঘটনাটির স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিক্ষোভ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে পাকিস্তান:
কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে তৈরি হওয়া বর্তমান সংকট মূলত প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার ফল।

পাকিস্তানের সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক তালাত হুসেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল শাসনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মূল সংকট থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি অদূরদর্শী প্রচেষ্টা।

তালাত হুসেইনের মতে, তথ্যপ্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, এতটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।

সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিশ্লেষক মুশাহিদ হুসেইন সাইয়্যেদ বলেন, ভুল নীতি, ভুল কৌশল ও ভুল চিন্তার কারণে একের পর এক গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার মতে, এর ফলে শুধু জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জনের প্রচেষ্টাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানও দুর্বল হবে।

সাংবাদিক জিরার খোরোর মতে, পরিস্থিতি এখন ‘পূর্ণাঙ্গ সংকটে’ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ প্রয়োজন, প্রচলিত রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নয়, যার সঙ্গে মানুষ আগে থেকেই পরিচিত।

অন্যদিকে সাংবাদিক রেজা রুমি বলেন, চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সংলাপ ও আলোচনা।

ভারতে পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার আবদুল বাসিতের মতে, কাশ্মীরের নির্বাচন কয়েক মাসের জন্য স্থগিত রাখা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, যারা সত্যিই বিশ্বাস করেন—‘আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তান আমাদের’ তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ চলছে?

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি কাশ্মীর আইনসভায় কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবিতে গত ৯ জুন থেকে অঞ্চলজুড়ে বিক্ষোভ ও লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে।

৫৩ সদস্যের কাশ্মীর আইনসভায় এই ১২টি সংরক্ষিত আসন দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। আইনসভার ৩৩ জন সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নারী ও অন্যান্য শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরও আটটি সংরক্ষিত আসন রয়েছে।

১৯৭০-এর দশকে কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত এসব আসন চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে আসা এবং কাশ্মীর সংকটের সমাধানের পর নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার আশায় বসবাসকারী মানুষদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া।

তবে যাদের জন্য এসব আসন সংরক্ষিত, তাদের অনেকেই বর্তমানে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বসবাস করেন না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা কার্যত এসব আসনে নির্বাচন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির দাবি, কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করতে হবে। সংগঠনটির মতে, এসব আসনের কারণে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হচ্ছে।

তাদের দাবি, আইনসভার সব আসনই এমন ব্যক্তিদের জন্য হওয়া উচিত, যারা প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বসবাস করেন।

অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। তাদের মতে, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় এবং নির্ধারিত সময়েই পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচনের আগে বিক্ষোভ প্রত্যাহারের লক্ষ্যে সরকার জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা মুজাফফরাবাদের দিকে লংমার্চের ডাক দেন।

এদিকে, কাশ্মীর আইনসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট সোমবার মিরপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট হবে ২ আগস্ট মুজাফফরাবাদে এবং শেষ ধাপে ১০ আগস্ট পুঞ্চ বিভাগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।