অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
হাতির চলাচলের পথে ও চারণভূমিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন করায় রোহিঙ্গাদের ওপর বন্যপশুটির আক্রমণের আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যে হাতির আক্রমণে চারজন রোহিঙ্গা মারা গেছেন। এ রকম ঘটনা আরও বাড়বে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও হাতি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
হাতি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠান আইইউসিএনের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মো. আবদুল মোতালেব প্রথম আলোকে বলেছেন, হাতি নিজের নির্দিষ্ট পথে নিজের মতো চলে। কোনো বাধাকেই সে বাধা মনে করে না। এই পথে রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা যেকোনো স্থাপনা থাকলে হাতি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করবেই। ভয়টা সেখানে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তা আলী কবির প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। তারা হাতির এলাকায় ঢুকে পড়ছে। সে কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।
১৪ অক্টোবর দুপুরে উখিয়ার বালুখালী-১ ক্যাম্পে বন্য হাতির আক্রমণে চারজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয় বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর মাসখানেক আগে বালুখালীর কাছে মধুরছড়া এলাকায় বন্য হাতির আক্রমণে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে ওই চারজনের মধ্যে কোনো রোহিঙ্গা ছিল না।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফে যাওয়ার পথে (পুরোনো পথ) এখন বহু ব্যানার আর সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। কিছু ব্যানার আর সাইনবোর্ড ক্যাম্প ও সহায়তার স্থান দেখানোর জন্য। বাকিগুলোর অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে এনজিও ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রচার। এদের ভিড়ে ‘সাবধান! বন্য হাতি চলাচলের পথ’ লেখা সাইনবোর্ড আর চোখে পড়ে না। আইইউসিএন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই সাইনবোর্ড বালুখালীতে রাস্তার পাশে লাগানো হয়েছিল।
গত মঙ্গলবার বালুখালীতে গিয়ে দেখা যায়, সাইনবোর্ডের কয়েক শ গজের মধ্যেই বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ক্যাম্প ছাড়াও শরণার্থীদের ত্রাণ-সহায়তার জন্য নানা কর্মকাণ্ড সেখানে চলছে। যে পথে এসে হাতি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক অতিক্রম করে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যায়, ঠিক সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীরা বড় দুটি তাঁবু গেড়েছেন।
হাতি বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তারা বলছেন, হাতি চলাচলের পথ হচ্ছে ‘করিডর’। এই করিডর দিয়ে হাতি এক বন বা পাহাড় থেকে অন্য বন ও পাহাড়ে যায়। বাংলাদেশে এ রকম করিডর আছে ১২টি। এর মধ্যে দুটি করিডর কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের মধ্যে পড়েছে। এর একটি বালুখালী-ঘুমধুম-মিয়ানমার। অন্যটি পানেরছড়া-রাজারকুল-নাইখ্যংছড়ি।
হাতি নিয়ে পিএইচডি থিসিস করছেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তা হক মাহবুব মোরশেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাতি তার শক্তি সম্পর্কে অবগত। হাতি অবাধ বিচরণ চায়। নিজের মতো খেতে চায়। এ ক্ষেত্রে সমঝোতা বোঝে না। নিজের খাবারে সংকট দেখা দিলে সে মানুষের বাড়িঘরে, ফসলের খেতে হানা দেয়।
আইইউসিএনের সর্বশেষ জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বন্য হাতি আছে ২৬৮টি (পুরুষ-৬৭, নারী ১৭২, শিশু ২৯)। বিভিন্ন চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক ও ব্যক্তির অধীনে আছে ৯৬টি। আর ৯৩টি হাতি ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে যাতায়াত করে।
মো. আবদুল মোতালেব বলেন, পূর্ণবয়স্ক একটি হাতির দৈনিক ১৫০ কেজি খাদ্যের দরকার হয়। হাতি নিজের চারণক্ষেত্রে খাবার না পেলে অন্য জায়গায় হানা দেবেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাঁশ ও উলুখড় হাতির প্রিয় খাবার। কাঁঠাল, কলাগাছও হাতি খায়। এখন বাঁশ কাটা বেড়েছে, উলুখড় দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘরের চালা তৈরি হচ্ছে। এতে হাতির খাদ্য সংকটের আশঙ্কা আছে।
বড় শরীর নিয়ে হাতি স্বাধীনভাবে চলবেই, পেটপুরে খেতে চেষ্টা করবে। না পারলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এই দ্বন্দ্বে হাতির সামনে প্রথমে পড়বে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের হাতির করিডর এলাকা থেকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া একটি সমাধান হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া হাতির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে বৈদ্যুতিক তারে স্বল্পমাত্রার বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি বিকল্প আছে। দড়িতে মরিচের গুঁড়া লাগিয়েও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। তবে দীর্ঘদিন হাতি স্বাধীনভাবে চলাচল করতে না পারলে এই পথ ছেড়ে, এই অঞ্চল ছেড়েই হয়তো চলে যাবে। তাই রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলছেন সবাই।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















