ঢাকা ০৭:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

একই দিনে তিন প্রজন্মের বিদায়

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় একই দিনে বিদায় নিয়েছেন তিন প্রজন্মের তিনজন। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন।

মোটরসাইকেল ও ট্রাকের এই ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন পল্লি চিকিৎসক নির্মল কুমার সরকার (৭০), তার ছেলে প্রশান্ত কুমার সরকার (৩৫) এবং সাত বছরের নাতি (প্রশান্ত কুমারের ছেলে) বন্ধন কুমার সরকার।

তাদের বাড়ি গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের চেংমারী কুড়িয়ার মোড় এলাকায়। বাবা ও ছেলে উভয়ই পেশায় পল্লি চিকিৎসক ছিলেন।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের তিন সদস্যের এমন আকস্মিক বিদায় ও বংশ প্রদীপ নিভে যাওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্তব্ধ হয়ে গেছে পরিবার, পরিজন ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের (দাওয়াত) উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে করে রওনা হন তারা তিনজন। পথিমধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল মন্থনা বাজার এলাকার মমো জুট মিলের সামনে রাস্তার কোল ঘেঁষে একটি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ঘাতক ট্রাককে সাইড দিতে রাস্তার বাম দিকে যান চালক প্রশান্ত কুমার। আর ট্রাকটি তখন বিপরীত দিক থেকে গতি নিয়ে রাস্তার মাঝামাঝি আসছিল; কিন্তু রাস্তার উপর শুকাতে দেওয়া খড়ের ওপর চাকা উঠে গেলে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তিনজনই ছিটকে পড়েন।

ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেল চালক প্রশান্ত কুমার সরকার মারা যান। পরে স্থানীয় এলাকাবাসী মুমূর্ষু অবস্থায় নির্মল কুমার সরকার এবং শিশু বন্ধনকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে নির্মল কুমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু বন্ধনকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশুটিও মারা যায়।

এদিকে সন্ধ্যায় শ্মশানে বাবা প্রশান্ত ও ঠাকুরদাদা নির্মল কুমারের চিতা জ্বলছিল, তখনই হাসপাতাল থেকে খবর আসে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছোট্ট বন্ধনও আর বেঁচে নেই। এই খবর শ্মশানে পৌঁছামাত্রই উপস্থিত শত শত মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে, চারদিকের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে এক বোবা কান্নায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, বন্ধনের বয়স মাত্র ৭ বছর হওয়ায় সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী তাকে চিতায় না পুড়িয়ে, রাতেই নিয়ম মেনে সমাধিস্থ (মাটি চাপা) করার মাধ্যমে সৎকার সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেশী পিকে সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এমনিতেই আজ আমরা পাথর হয়ে গেছি। শ্মশানে যখন জেঠা আর দাদার দাহ হচ্ছিল, সারা এলাকা নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে যখন বন্ধনের মৃত্যুর খবর এলো… আর বলতে পারছি না।

গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান দুলু বলেন, এ রকম একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর আমাদের পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিন প্রজন্মের একই দিনে এভাবে বিদায় কেউই মেনে নিতে পারছে না। পল্লি চিকিৎসায় এলাকায় ওনাদের অনেক অবদান ছিল। জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ, তবে আমাদের আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আব্দুস ছবুর জানান, ঘাতক ট্রাকটি আটক করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

এ জাতিকে কখনো বিভাজন করা সম্ভব নয় : রিজভী

একই দিনে তিন প্রজন্মের বিদায়

আপডেট সময় ০৬:১০:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় একই দিনে বিদায় নিয়েছেন তিন প্রজন্মের তিনজন। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন।

মোটরসাইকেল ও ট্রাকের এই ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন পল্লি চিকিৎসক নির্মল কুমার সরকার (৭০), তার ছেলে প্রশান্ত কুমার সরকার (৩৫) এবং সাত বছরের নাতি (প্রশান্ত কুমারের ছেলে) বন্ধন কুমার সরকার।

তাদের বাড়ি গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের চেংমারী কুড়িয়ার মোড় এলাকায়। বাবা ও ছেলে উভয়ই পেশায় পল্লি চিকিৎসক ছিলেন।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের তিন সদস্যের এমন আকস্মিক বিদায় ও বংশ প্রদীপ নিভে যাওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্তব্ধ হয়ে গেছে পরিবার, পরিজন ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের (দাওয়াত) উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে করে রওনা হন তারা তিনজন। পথিমধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল মন্থনা বাজার এলাকার মমো জুট মিলের সামনে রাস্তার কোল ঘেঁষে একটি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ঘাতক ট্রাককে সাইড দিতে রাস্তার বাম দিকে যান চালক প্রশান্ত কুমার। আর ট্রাকটি তখন বিপরীত দিক থেকে গতি নিয়ে রাস্তার মাঝামাঝি আসছিল; কিন্তু রাস্তার উপর শুকাতে দেওয়া খড়ের ওপর চাকা উঠে গেলে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তিনজনই ছিটকে পড়েন।

ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেল চালক প্রশান্ত কুমার সরকার মারা যান। পরে স্থানীয় এলাকাবাসী মুমূর্ষু অবস্থায় নির্মল কুমার সরকার এবং শিশু বন্ধনকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে নির্মল কুমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু বন্ধনকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশুটিও মারা যায়।

এদিকে সন্ধ্যায় শ্মশানে বাবা প্রশান্ত ও ঠাকুরদাদা নির্মল কুমারের চিতা জ্বলছিল, তখনই হাসপাতাল থেকে খবর আসে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছোট্ট বন্ধনও আর বেঁচে নেই। এই খবর শ্মশানে পৌঁছামাত্রই উপস্থিত শত শত মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে, চারদিকের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে এক বোবা কান্নায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, বন্ধনের বয়স মাত্র ৭ বছর হওয়ায় সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী তাকে চিতায় না পুড়িয়ে, রাতেই নিয়ম মেনে সমাধিস্থ (মাটি চাপা) করার মাধ্যমে সৎকার সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেশী পিকে সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এমনিতেই আজ আমরা পাথর হয়ে গেছি। শ্মশানে যখন জেঠা আর দাদার দাহ হচ্ছিল, সারা এলাকা নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে যখন বন্ধনের মৃত্যুর খবর এলো… আর বলতে পারছি না।

গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান দুলু বলেন, এ রকম একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর আমাদের পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিন প্রজন্মের একই দিনে এভাবে বিদায় কেউই মেনে নিতে পারছে না। পল্লি চিকিৎসায় এলাকায় ওনাদের অনেক অবদান ছিল। জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ, তবে আমাদের আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আব্দুস ছবুর জানান, ঘাতক ট্রাকটি আটক করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।