আকাশ স্পোর্টস ডেস্ক :
বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চ আর মাঠের লড়াইয়ের উত্তেজনার আড়ালে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভূ-রাজনীতি নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় চলমান ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসরটি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে খেলা আর রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ‘ফুটবলে রাজনীতি থাকা উচিত নয়’ এমন বুলি আওড়ালেও, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তার নেয়া পদক্ষেপগুলো তাকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত জীবনের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের গভীর সংযোগ রয়েছে, যা তার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। তার স্ত্রী লেবানিজ বংশোদ্ভূত এবং সম্প্রতি তিনি লেবাননের নাগরিকত্বও লাভ করেছেন। এই পটভূমিতে, বিশেষ করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু এবং বিভিন্ন দেশের প্রতি ফিফার ভিন্ন ভিন্ন নীতি নিয়ে তার সমালোচনা বাড়ছে। সমালোচকরা মনে করছেন, ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা প্রধান হিসেবে তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন।
চলমান বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের প্রবেশের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। খোদ ইরান দলের কোচ আমীর ঘালেনোয়েই তার দলকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিপীড়িত দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ ইনফান্তিনো এই পরিস্থিতির সমাধানে দৃশ্যত কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেননি, বরং নিয়ম রক্ষার খাতিরে লোক দেখানো পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।
বিশ্বরাজনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারের নেশায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও গড়ে তুলেছেন ঘনিষ্ঠ সখ্যতা। বিশেষ করে ট্রাম্পের স্বপ্নের নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রত্যাশা পূরণ করতে ইনফান্তিনো তাকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ফিফার মতো একটি ক্রীড়া সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তোষামোদ করার এই প্রবণতা ফুটবলের মূল চেতনাকে ক্ষুন্ন করছে বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা।
কাতার বিশ্বকাপের সময় অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রশ্নে ইনফান্তিনোর দেওয়া বক্তব্য ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। তিনি নিজেকে কাতারি, আরব এমনকি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে দাবি করে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চরম রোষানলে পড়ে। ফুটবলের উন্নয়নে শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে একরকম অবজ্ঞা করার পাশাপাশি, তিনি বরং আয়োজক দেশগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনে মরক্কোকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে পর্দার আড়ালে কূটনীতির অভিযোগ উঠেছে। ফিফা নিরপেক্ষ থাকার কথা বললেও, ইনফান্তিনোর গোপন হস্তক্ষেপে এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয়। একইসঙ্গে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে সৌদি আরবকে এককভাবে নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত তড়িঘড়ি এবং স্বচ্ছতাহীন, যা আবারও ফিফার একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইনফান্তিনোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। রাশিয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিলেও, ইসরায়েলের বেলায় তিনি নমনীয় নীতি অবলম্বন করেছেন। গাজায় চলমান পরিস্থিতিতেও ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে বরং ‘আলোচনা ও মধ্যস্থতা’র নামে তিনি সময়ক্ষেপণ করছেন। এমনকি ফিলিস্তিনি ফুটবল প্রতিনিধিদের সামনে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের সাথে হ্যান্ডশেক করতে বাধ্য করার চেষ্টা করে তিনি চরম কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই ‘মিডল ইস্ট প্লেবুক’ এখন ফুটবলের চেয়ে রাজনীতির মঞ্চ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পাচ্ছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষমতার প্রভাব এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতিফলন স্পষ্ট। বিশ্বকাপের মতো এত বড় আসর যেখানে বিশ্ব ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে ইনফান্তিনোর বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো কেবল মাঠের খেলাকেই নয়, বরং পুরো বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















