আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে বাণিজ্য– সব ক্ষেত্রেই চীনের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস চীন। আবার দেশে যেসব বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশেও চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, দেশটি বর্তমানে যে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার অংশ হিসেবে অনেক শ্রমনির্ভর শিল্প বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করছে তারা। এসব শিল্প ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে যাচ্ছে। বাংলাদেশও চাইলে চীনের এই বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে।
আমার ধারণা, সম্প্রতি চীনের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আগে এ ধরনের একটি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এলেও আইনি জটিলতায় বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। গত সপ্তাহে বর্তমান সরকার সেটি অনুমোদন দিয়েছে। সেখানে যদি চীনা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেন, তাহলে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে। প্রথমত, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আসবে এবং বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের আগ্রহ একটি পরিচিত বাস্তবতা। তবে এ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখি না। ভারত জানে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চীনের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে; তুলনামূলকভাবে ভারতের ওপর সেই নির্ভরতা কম। ফলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে ভারত অহেতুক উদ্বিগ্ন হবে বলে মনে করি না। বিষয়টি যদি সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অত্যধিক বিস্তৃত হতো, তাহলে ভিন্ন আলোচনার অবকাশ থাকত। তবে বাংলাদেশ এখন বহুমুখীকরণের পথে এগোচ্ছে এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই এ বিষয়ে ভারতের অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখি না।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বর্তমানে তারা চীনকে তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। সে কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অগ্রগতি তারা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকার যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে এসব বিষয় পর্যালোচনা করবে। কারণ, বাংলাদেশ নিশ্চয়ই চায় না যে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র– এই তিন গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বরং সম্পর্কগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সামঞ্জস্য বজায় রাখাই বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সম্প্রতি আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একটি পত্রিকায় দেখলাম, বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা করছে। এ প্রকল্পে চীন ও ভারত উভয়েরই আগ্রহ ছিল এবং বিভিন্ন প্রস্তাবও এসেছিল। আমার মতে, যদি বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে সেটি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচিত হবে। এমন চিন্তাভাবনাকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি।
দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও এগিয়ে যেতে পারে। তাদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পূরক বাংলাদেশের জন্য যেমন লাভজনক, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গেও চীনের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘এক চীন’ নীতির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ ও চীন বহু বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করে। আমরা দেখছি, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক মাত্রা দেবে।
তবে একটি বিষয় আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, চীনের বর্তমান দক্ষতা ও সক্ষমতা থেকে যদি আমরা সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে চাই, তাহলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে। চীনা বিনিয়োগকারীরা যখন আসবেন, তখন তারা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবেন। ব্যয়, লাভ, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য মুনাফার বিষয়গুলো তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করবেন। ফলে আমরা যেমন তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা প্রত্যাশা করি, তেমনি সেই সহযোগিতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সক্ষমতাও আমাদের তৈরি করতে হবে। সেটি করতে পারলে, সফরের মাধ্যমে চীনের কাছ থেকে যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমর্থনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা আরও দ্রুত বাস্তব রূপ পেতে পারে।
স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে বাণিজ্য– বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। আমরা কয়েক বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করি, কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের রপ্তানি অনেক কম। এটি কোনো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নয়। যদি আমরা এই সম্পর্ককে আরও সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিতে চাই, তাহলে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক শক্তি বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাত হোক কিংবা অন্য কোনো খাত— সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। তবেই চীনের কাছ থেকে যে সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি, তা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















