আকাশ স্পোর্টস ডেস্ক :
মিশরের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা তারকা মোহাম্মদ সালাহর সামনে হয়তো এটাই শেষ বিশ্বকাপ। আর সেই বিশ্বকাপেই দেশের হয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার প্রত্যয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছেন তিনি। মিশরের লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রথম জয় এবং স্মরণীয় সাফল্য অর্জন।
আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি মিশর। রেকর্ড সাতবার আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন উদ্দীপনায়। তবে মহাদেশীয় পর্যায়ে এত সাফল্য থাকলেও বিশ্বকাপের আসরে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই ফারাওদের। মিশরের সেরা বিশ্বকাপ অর্জন এসেছিল ১৯৩৪ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত আসরে। সেবার তারা শেষ ষোলোতে খেলেছিল, যা এখনো পর্যন্ত দেশটির সর্বোচ্চ সাফল্য; যদিও সে বিশ্বকাপে খেলা শুরুই হয়েছিল শেষ ১৬ থেকে।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে সালাহ নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে ছিলেন। লিভারপুলে প্রথম মৌসুমেই ৪৪ গোল করে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্ডার সার্জিও রামোসের ধাক্কায় গুরুতর কাঁধের চোট পান সালাহ।
চোট কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নিলেও পুরোপুরি ফিট ছিলেন না তিনি। দুই ম্যাচে দুটি গোল করেও মিশরকে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেননি। স্বাগতিক রাশিয়া, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরে টুর্নামেন্ট শেষ করতে হয়েছিল দলটিকে।
এবারের বিশ্বকাপে ৩৩ বছর বয়সি সালাহ একেবারে ভিন্ন বাস্তবতায় মাঠে নামছেন। লিভারপুলে তার নয় বছরের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে সম্প্রতি। অ্যানফিল্ডে শেষ ম্যাচের পর আবেগাপ্লুত হয়ে একাধিকবার চোখের জল ফেলতে দেখা যায় তাকে।
লিভারপুলের হয়ে ২৫৭ গোল, দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং একটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জিতে ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিয়েছেন তিনি।
বিদায়ী বার্তায় সালাহ বলেন, আমরা এই ক্লাবকে তার প্রাপ্য জায়গায় ফিরিয়ে এনেছি।
মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও সালাহর প্রভাব বিস্তৃত। ২০১৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি। সেখানে তাকে মিশরীয়, লিভারপুল সমর্থক এবং বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি প্রতীকী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতেও সরব ছিলেন সালাহ। আরব বিশ্বে নারীর অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন তিনি। এছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলি হামলার পর মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
তবে এখন মিশরবাসীর প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একটি স্মরণীয় সাফল্য এনে দেবেন তাদের অধিনায়ক।
জাতীয় দলের হয়ে এখনো বড় কোনো শিরোপা জেতা হয়নি সালাহর। ২০১৭ ও ২০২১ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের ফাইনালে উঠেও শিরোপার স্বাদ পাননি তিনি। দুইবারই রানার্সআপ হয়ে ফিরতে হয়েছে।
মিশরের ফরোয়ার্ড মাহমুদ হাসান ত্রেজেগে সালাহকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, আমার কাছে সালাহ বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। আমাদের জন্য তার উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন তারকা নন, একজন নেতা, যিনি দলকে আত্মবিশ্বাস ও শক্তি জোগান।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সালাহ ও ত্রেজেগে মিলে মিশরের ২০ গোলের মধ্যে ১৪টিই করেছেন। যা তাদের আক্রমণভাগের কার্যকারিতার প্রমাণ দেয়।
তবে ক্লাব ফুটবলে সালাহর সর্বশেষ মৌসুমটি খুব একটা উজ্জ্বল ছিল না। প্রিমিয়ার লিগে তার পারফরম্যান্স আগের তুলনায় অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে, যা লিভারপুল ছাড়ার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এক বছর আগে অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পুরস্কার হিসেবে নতুন দুই বছরের চুক্তি পেলেও পরে কোচ আর্নে স্লটের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। ডিসেম্বর মাসে টানা তিন ম্যাচ বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল তাকে।
আফ্রিকান কাপ অব নেশনস শেষে দলে ফিরে ইনজুরির কারণে সুযোগ পেলেও পুরো মৌসুমে ৪১ ম্যাচে মাত্র ১২ গোল করেন সালাহ। লিভারপুল ক্যারিয়ারে এক মৌসুমে এত কম গোল আর কখনোই করেননি তিনি।
তবে তাকে আশার আলো দেখাচ্ছে জাতীয় দলের হয়ে তার সাম্প্রতিক ফর্ম এবং মিশরের পারফরম্যান্স। ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘জি’-তে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও ইরানের বিপক্ষে খেলবে মিশর।
আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে প্রথম চার ম্যাচেই গোল করেছিলেন সালাহ। যদিও শেষ পর্যন্ত সাবেক লিভারপুল সতীর্থ সাদিও মানের সেনেগালের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হেরে আরেকবার হতাশ হতে হয় তাকে।
মার্চের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে চোটের কারণে খেলতে পারেননি সালাহ। তবে তার অনুপস্থিতিতেও কোচ হোসাম হাসানের দল সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় এবং স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে।
সাবেক মিশর অধিনায়ক আহমেদ ফাতি বিশ্বাস করেন, এবারের বিশ্বকাপে সালাহ বিশেষ কিছু করে দেখাতে পারবেন।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি ২০২৬ বিশ্বকাপে সালাহ ফারাওদের হয়ে বড় কিছু অর্জন করবে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমি তার সঙ্গে খেলেছি। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক এবং ২০১৮ বিশ্বকাপেও আমরা একসঙ্গে ছিলাম। সে সবসময় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে, এবারও সেটাই করবে বলে আশা করি।
মিশরের কোটি কোটি সমর্থকের মতো ফাতিরও বিশ্বাস, ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে সালাহ হয়তো এমন একটি অধ্যায় রচনা করবেন, যা তাকে শুধু দেশের নয়, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও আরও উজ্জ্বল করে তুলবে।
ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান:
ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত মোহাম্মদ সালাহ ৮৩ ম্যাচে করেছেন ৬০ গোল।
সিনিয়র ক্লাব ক্যারিয়ারে লিভারপুলের হয়ে ৪৪২ ম্যাচে ২৫৭ গোলসহ অন্যান্য ক্লাবের হয়ে ২৪১ ম্যাচে করেছেন ৭৫ গোল।
এ ছাড়া উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ১ বার, প্রিমিয়ার লিগ ২ বারসহ ক্যারিয়ারে শিরোপা জিতেছেন ১১ বার।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















