ঢাকা ০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ নতুন দলের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে যারা ইরানের সামনে এখন কেবল দুই পথ—চুক্তি অথবা আত্মসমর্পণ: ট্রাম্প পাঁচ দফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি সরকার দমনে ব্যস্ত, দ্রব্যমূল্য-গ্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: গোলাম পরওয়ার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগদখলের সুযোগ, মন্ত্রিসভায় খসড়া পাশ শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে হুমায়ুন কবির রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘নতুন মাত্রা’ যোগ করেছেন তারেক রহমান: চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার

বেঁচে থাকার তাগিদে সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আফগানরা

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

আফগানিস্তানের গোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারান। ভোরের প্রথম আলো তখনই ফুটতে শুরু করেছে। বরফে মোড়ানো সিয়াহ কোহ পাহাড়ের নিচে ধুলোমাখা এক চত্বরে ভিড় করেছেন শত শত মানুষ। কারো গায়ে পাতলা চাদর, কারো মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। সবাই একই অপেক্ষায়—কেউ যদি একটি কাজের সুযোগ দেয়। কারণ সেই এক দিনের আয়ের ওপরই নির্ভর করছে, সেদিন তাদের সন্তানদের খাবার জুটবে কিনা।

তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি মন্দার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চরম দারিদ্র্য ও খাদ্য সংকটে হাজারো পরিবার এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক বাবা বাধ্য হচ্ছেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে, যা কল্পনাও করা কঠিন—নিজের সন্তানকে বিক্রি করা। খবর বিবিসির।

৪৫ বছর বয়সি জুমা খান গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দৈনিক আয় ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা)। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, সন্তানরা টানা তিন রাত না খেয়ে থেকেছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় স্ত্রী ও সন্তানরা কাঁদছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ময়দা কেনার জন্য ধার নিতে হয়েছে। প্রতিনিয়ত তার ভয়—বাচ্চারা না খেয়েই হয়তো মারা যাবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এখন ন্যূনতম প্রয়োজনও পূরণ করতে পারছে না। বেকারত্ব, খাদ্য সংকট ও চিকিৎসা-অভাব মিলিয়ে দেশটির বহু পরিবার চরম সীমার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। গোর প্রদেশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

চাঘচারানের শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা রাবানি কথা বলতে গিয়ে কেঁপে ওঠেন। তিনি বলেন, ফোনে শুনেছি সন্তানরা দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যাই একমাত্র পথ। পরে ভাবলাম, আমি না থাকলে তাদের দেখবে কে?

আরেক বৃদ্ধ খাজা আহমদ, যিনি বয়সের কারণে কাজ পাচ্ছেন না, কাঁদতে কাঁদতে জানান, তার বড় সন্তান আগেই মারা গেছে। বাকি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি এখনও কাজ খুঁজছেন, কিন্তু কেউ তাকে কাজ দিচ্ছে না।

চাঘচারানের পাহাড়ঘেরা এক জরাজীর্ণ ঘরে বাস করেন আব্দুল রশিদ আজিমি। তার সাত বছর বয়সি যমজ কন্যা রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত। ঋণ আর দারিদ্র্য আমাকে অসহায় করে ফেলেছে। সন্তানরা যখন বলে ‘বাবা, রুটি দাও’—তখন আমার কিছুই দেওয়ার থাকে না।

এমনই আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা সাঈদ আহমদের। তার পাঁচ বছরের মেয়ে শায়িকার গুরুতর অসুস্থতা ধরা পড়ার পর চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে তিনি মেয়েকে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দেন ২ লাখ আফগানিতে (প্রায় ৩,২০০ ডলার)। তার ভাষায়, ‘অপারেশন না করালে মেয়েটি বাঁচত না। তাই বাধ্য হয়েছি।’

কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক সহায়তায় পরিবারগুলো খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা পেত। কিন্তু সেই সহায়তা কমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, সহায়তা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খরা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা।

চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালেও একই চিত্র। নবজাতক বিভাগে বেড ফাঁকা নেই। কোথাও কোথাও একই বিছানায় দুই শিশু রাখা হয়েছে। অধিকাংশই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, কেউ কেউ শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত।

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বেডের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে সন্তানদের অকালেই হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

চাঘচারানের শ্রমবাজারের মানুষগুলো আবারও ঘরে ফেরেন—কারও হাতে সামান্য রুটি, কারও হাতে শূন্যতা। তবুও পরদিন ভোরে তারা আবার সেখানে ফিরবেন, একটিমাত্র আশায়—হয়তো সেদিন তাদের সন্তানদের জন্য কিছু খাবার জুটবে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

প্রেক্ষাপট: দুই দিনের সফরে আগামীকাল ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বেঁচে থাকার তাগিদে সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আফগানরা

আপডেট সময় ০১:২২:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

আফগানিস্তানের গোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারান। ভোরের প্রথম আলো তখনই ফুটতে শুরু করেছে। বরফে মোড়ানো সিয়াহ কোহ পাহাড়ের নিচে ধুলোমাখা এক চত্বরে ভিড় করেছেন শত শত মানুষ। কারো গায়ে পাতলা চাদর, কারো মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। সবাই একই অপেক্ষায়—কেউ যদি একটি কাজের সুযোগ দেয়। কারণ সেই এক দিনের আয়ের ওপরই নির্ভর করছে, সেদিন তাদের সন্তানদের খাবার জুটবে কিনা।

তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি মন্দার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চরম দারিদ্র্য ও খাদ্য সংকটে হাজারো পরিবার এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক বাবা বাধ্য হচ্ছেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে, যা কল্পনাও করা কঠিন—নিজের সন্তানকে বিক্রি করা। খবর বিবিসির।

৪৫ বছর বয়সি জুমা খান গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দৈনিক আয় ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা)। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, সন্তানরা টানা তিন রাত না খেয়ে থেকেছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় স্ত্রী ও সন্তানরা কাঁদছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ময়দা কেনার জন্য ধার নিতে হয়েছে। প্রতিনিয়ত তার ভয়—বাচ্চারা না খেয়েই হয়তো মারা যাবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এখন ন্যূনতম প্রয়োজনও পূরণ করতে পারছে না। বেকারত্ব, খাদ্য সংকট ও চিকিৎসা-অভাব মিলিয়ে দেশটির বহু পরিবার চরম সীমার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। গোর প্রদেশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

চাঘচারানের শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা রাবানি কথা বলতে গিয়ে কেঁপে ওঠেন। তিনি বলেন, ফোনে শুনেছি সন্তানরা দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যাই একমাত্র পথ। পরে ভাবলাম, আমি না থাকলে তাদের দেখবে কে?

আরেক বৃদ্ধ খাজা আহমদ, যিনি বয়সের কারণে কাজ পাচ্ছেন না, কাঁদতে কাঁদতে জানান, তার বড় সন্তান আগেই মারা গেছে। বাকি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি এখনও কাজ খুঁজছেন, কিন্তু কেউ তাকে কাজ দিচ্ছে না।

চাঘচারানের পাহাড়ঘেরা এক জরাজীর্ণ ঘরে বাস করেন আব্দুল রশিদ আজিমি। তার সাত বছর বয়সি যমজ কন্যা রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত। ঋণ আর দারিদ্র্য আমাকে অসহায় করে ফেলেছে। সন্তানরা যখন বলে ‘বাবা, রুটি দাও’—তখন আমার কিছুই দেওয়ার থাকে না।

এমনই আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা সাঈদ আহমদের। তার পাঁচ বছরের মেয়ে শায়িকার গুরুতর অসুস্থতা ধরা পড়ার পর চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে তিনি মেয়েকে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দেন ২ লাখ আফগানিতে (প্রায় ৩,২০০ ডলার)। তার ভাষায়, ‘অপারেশন না করালে মেয়েটি বাঁচত না। তাই বাধ্য হয়েছি।’

কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক সহায়তায় পরিবারগুলো খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা পেত। কিন্তু সেই সহায়তা কমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, সহায়তা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খরা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা।

চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালেও একই চিত্র। নবজাতক বিভাগে বেড ফাঁকা নেই। কোথাও কোথাও একই বিছানায় দুই শিশু রাখা হয়েছে। অধিকাংশই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, কেউ কেউ শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত।

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বেডের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে সন্তানদের অকালেই হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

চাঘচারানের শ্রমবাজারের মানুষগুলো আবারও ঘরে ফেরেন—কারও হাতে সামান্য রুটি, কারও হাতে শূন্যতা। তবুও পরদিন ভোরে তারা আবার সেখানে ফিরবেন, একটিমাত্র আশায়—হয়তো সেদিন তাদের সন্তানদের জন্য কিছু খাবার জুটবে।