আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১৬৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এ রায়ে মামলার ব্যাপক অসংগতি তুলে ধরেছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে ট্রাইব্যুনাল অস্ত্র-গুলির হিসাব, ভিডিও ফুটেজের সীমাবদ্ধতা এবং চানখাঁরপুল অভিযানে অংশ নেওয়া আরও অন্তত ৪০ পুলিশ সদস্যকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিন কনস্টেবলের সাক্ষ্য নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে রায়ে। একই সঙ্গে অনেক দোষী পুলিশ সদস্যকে কেন এই মামলার আসামি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো, তার কোনো যৌক্তিক কারণ বা ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গত ২৬ জানুয়ারি এই রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং পুলিশের আরও পাঁচ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। রায়ের অনুলিপি বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতেও রয়েছে। রায়ে ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা বিভাগের সাবেক উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রায়ে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড, শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড এবং একই থানার সাবেক তিন কনস্টেবল মো. সুজন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের মধ্যে আরশাদ হোসেন, মো. সুজন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম কারাগারে রয়েছেন। বাকি চার আসামি পলাতক।
রায়ের সমাপনী মন্তব্যে বলা হয়েছে, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে নিরপরাধ, নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে চানখাঁরপুল এলাকায় মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মাকে লেখা শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের চিঠিটি আমাদের সবার হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালে যখন চিঠিটি পাঠ করা হচ্ছিল তখন আদালত কক্ষে উপস্থিত প্রায় সবাইকে চোখের জল ফেলতে দেখা গিয়েছে। এই বীরদের এবং তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো পৃথিবীতে কিছুই নেই। একই সঙ্গে এটা মেনে নিতে হবে যে, বিচারের নামে কোনো নিরপরাধকে যেমন শাস্তি দেওয়া উচিত না, ঠিক তেমিন উচিত না কোনো অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের চেয়ে বেশি শাস্তি দেওয়া। ট্রাইব্যুনালের দৃঢ় বিশ্বাস যে অভিযুক্তদের দেওয়া সাজা পর্যাপ্ত এবং ন্যায়বিচারের লক্ষ্য পূরণ করবে।’
রায়ে ‘অমীমাংসিত প্রশ্ন’ নামে একটি অংশ রয়েছে। এই অংশে ট্রাইব্যুনাল মামলার বেশ কিছু অসংগতি তুলে ধরেছেন। ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন রেখেছেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষী কনস্টেবল (সাবেক) অজয় ঘোষ, আবদুর রহমান ও আসিফ খানের নামে শাহবাগ থানা থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ ইস্যু করা হয়েছিল। তাঁরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। থানার রেজিস্টারে দেখা যায়, অজয়ের নামে ৪০টি গুলি ইস্যু করা হয়েছিল। তার মধ্যে তিনি ১৮টি ফেরত অর্থাৎ জমা দেন। নথিভুক্ত এই প্রমাণ উপেক্ষা করে ট্রাইব্যুনাল কি তিন কনস্টেবল সাক্ষীর মৌখিক বর্ণনা বিশ্বাস করবে? রায়ে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যদি ধরে নেওয়া হয়, সাক্ষী অজয় তৎকালীন এডিসি আখতারুলের আদেশ অমান্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন আসে অজয় কেন আখতারুল বা সুজনের কাছে তাঁর অস্ত্র-গোলাবারুদ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানাননি? জব্দ তালিকার কথা উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুল ইসলাম সক্রিয়ভাবে চানখাঁরপুল অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চানখাঁরপুল অভিযানে আরও অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আটজনের অনুকূলে চায়না রাইফেল, ১৫ জনের অনুকূলে শটগান ও দুজনের অনুকূলে এসএমজি ইস্যু করা হয়েছিল। তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ গুলিও ইস্যু করা হয়েছিল। রেজিস্টারে দেখা যায়, মাত্র চার থেকে পাঁচজন তাদের নামে ইস্যু করা অস্ত্র-গোলাবারুদ জমা দিয়েছেন। অন্যদের অস্ত্র-গোলাবারুদের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।’
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, যদি তিন কনস্টেবল আসামির কার্যকলাপের ভিডিওগুলোর ওপর নির্ভর করা হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে ঘটনাস্থলে থাকা বাহিনীর অন্য সদস্যদের কার্যকলাপের ভিডিও কোথায়? তা ছাড়া, চানখাঁরপুল এলাকা রমনা অঞ্চলের আওতাভুক্ত। কিন্তু মামলায় রমনা বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসির) অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। প্রাসঙ্গিক সময়ে তিনি কী করছিলেন, কোথায় ছিলেন?
রায়ে আদালত বলেন, প্রাণঘাতী অস্ত্র-গুলি নিয়ে মোতায়েন থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সদস্যদের কেন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা একেবারেই বোধগম্য নয়। ঘটনার সময় কে অস্ত্র ব্যবহার করেছেন বা কে করেননি, এ বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একেবারেই ঠিক না। আসামি সাবেক এডিসি আখতারুল সরকার পতনের পর দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, তবুও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ফলে একপর্যায়ে তিনি পালিয়ে যান। ট্রাইব্যুনাল মনে করে আখতারুলকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।
রায়ে বলা হয়েছে, এমন অসংগতি থাকার পরও এটি স্পষ্ট যে, ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার জন্য এককভাবে দায়ী আসামি হাবিবুর, সুদীপ ও আখতারুল। অন্য আসামিরাও তাঁদের সম্পৃক্ততার মাত্রা অনুযায়ী দায়ী। তবে তাদের হত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী কনস্টেবল অজয় ঘোষ, আবদুর রহমান ও আসিফ খানের জবানবন্দির কথা উল্লেখ করে রায়ে আরও বলা হয়েছে, অজয়ের কাছ থেকে একটি চায়না রাইফেল ও গুলি নিয়ে জোর করে সুজনকে দেন আখতারুল। এরপর সুজন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। তবে অজয় ও আসিফের সাক্ষ্য সত্য হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। কারণ, তাঁরাও চানখাঁরপুল অভিযানে অস্ত্র-গুলিসহ অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই সাক্ষী কনস্টেবল অজয়, আবদুর রহমান ও আসিফের এই মামলার আসামি হওয়ার কথা ছিল। ফলে নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে তারা সুজনকে জড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন, এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রায়ে বলা হয়েছে, এটি স্পষ্ট যে আসামি সুজন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। যদি তৎকালীন এডিসি আখতারুল তার হাতে অস্ত্র তুলে না দিতেন, তাহলে তিনি গুলি করতে পারতেন না। আর তা না হলে তাকে আসামি করাও সম্ভব হতো না। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন, চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজে আসামি সুজনকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালাতে দেখা যায়। কিন্তু ভিডিওতে তাকে কোনো নির্দিষ্ট আন্দোলনকারীকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা যায়নি। তা ছাড়া তার গুলিতে কোনো আন্দোলনকারী আহত বা নিহত হয়েছেন, তা ওই ভিডিতে স্পষ্ট নয়। যদিও কার গুলিতে কে আহত বা নিহত হয়েছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা আবশ্যক নয়। সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে, গুলিবর্ষণ ছিল বৃষ্টির মতো। অর্থাৎ অনেকের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
আসামি হাবিবুরের বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে, তিনি ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের সব ইউনিটকে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন। আসামি ইমরুল ও আরশাদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে চানখাঁরপুল এলাকার অভিযান পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারাও হাবিবুর, সুদীপ ও আখতারুলের আদেশের অধীন ছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ছাড়া তাঁদের আর কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা পাওয়া যায় না।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























