আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা এবং পরপরই অন্য আইনে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি কার্যকরে আপাতত পদক্ষেপ নেবে না বাংলাদেশ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চুক্তি কার্যকরের বিষয়ে ওয়াশিংটন থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ করা হলে তখন প্রতিক্রিয়া জানাবে ঢাকা।
এদিকে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা সার্বিক বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আগামীকাল মঙ্গলবার সরকারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বারবার শুল্ক পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তারা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি বাতিল বা সংশোধনের কথাও বলছেন তারা।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা রেটিফিকেশন প্রয়োজন। আপাতত বাংলাদেশ ‘রেটিফিকেশন’ করবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি অনুমোদন করে বাংলাদেশকে অবহিত করে, তাহলে বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া জানাবে। তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হবে– যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ‘পাল্টা শুল্ক’ অবৈধ ঘোষণা করলেও তারা কীসের ভিত্তিতে অনুমোদন করল। তিনি জানান, আপাতত বাংলাদেশ এ চুক্তি নিয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু করবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের অপেক্ষা করবে।
বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করার পর অন্য আইনের আওতায় ইতোমধ্যে দেশটি বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এ শুল্ক যদি সব দেশের ওপর একই হারে হয়, তাহলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকবে না। তবে দেশভেদে শুল্ক কমানোর সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ কমানোর বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেবে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে মর্মে লিখিত নোটিশ বিনিময়ের ৬০ দিন পর এটি কার্যকর হবে। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে অন্য কোনো তারিখও নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে। আবার যে কোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ৬০ দিন পর, অথবা সম্মত অন্য তারিখে অবসান কার্যকর হবে।
চুক্তির আগে সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্কহার ছিল ২০ শতাংশ, যা এখনও কার্যকর। চুক্তি কার্যকর হলে ১৯ শতাংশ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে কোনো পাল্টা শুল্ক আরোপ না করার ঘোষণা দেওয়া ছিল। তবে এ সুবিধা পেতে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে নানা ধরনের শর্ত মেনে নিয়েছে বাংলাদেশ।
চুক্তিতে নানা শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক-অসামরিক কেনাকাটা বাড়ানোসহ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিতে শুল্ক ও অশুল্ক ব্যাপক ছাড়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি রয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু দেশ থেকে কমানোর অঙ্গীকার করেছে। চুক্তি প্রকাশিত হওয়ার পর অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই একে জনস্বার্থবিরোধী এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন।
কাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক-
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্কের বাস্তবতা নিয়ে মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে শুল্ক কাঠামোয় অনিশ্চয়তা। শুল্কের এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্র্যান্ড-ক্রেতারা শুল্কহার নিয়ে এত অনিশ্চয়তায় থাকলে কীসের ভিত্তিতে দর নির্ধারণ করবেন। শুল্ক হার যাই হোক না কেন, অনিশ্চয়তাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।
তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি তারা পর্যালোচনা করেছেন। যদি অন্যদের জন্য ১৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক হয় এবং বাণিজ্যচুক্তির কারণে যদি বাংলাদেশের ১৯ শতাংশ হয়, তাহলে ক্ষতি হবে। এমনিতেই অনেক অন্যায্য শর্ত মেনে চুক্তি করা হয়েছে। যেহেতু মার্কিন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পাল্টা শুল্কই বাতিল হয়েছে, সেহেতু চুক্তিটি বাতিলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ চান তারা।
বিকেএমইএর সভাপতি বলেন, বারবার শুল্ক পরিবর্তনের কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে গত কয়েক মাসে অনাকাঙ্ক্ষিত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন ব্র্যান্ড, ক্রেতা এমনকি ভোক্তারাও এতে বিরক্ত। কারণ, রপ্তানি বাণিজ্যের প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। মাঝপথে এ রকম শুল্ক পরিবর্তন হলে গোটা প্রক্রিয়া এলোমেলো হয়ে যায়। গত এক-দেড় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণ বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বড় রকমের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। এমনকি এখন যে ১৫ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হচ্ছে, তাও হয়তো যে কোনো মুহূর্তে আবার পরিবর্তন হতে পারে। এ কারণে মার্কিন ব্র্যান্ড-ক্রেতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চুক্তি বহাল থাকার কথা বলছে মার্কিন প্রশাসন-
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যেসব দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেসব চুক্তি ‘অবিকল বহাল’ থাকবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশ মার্কিন অবস্থান আরও পরিষ্কার করার দাবি তুলেছে। তবে রায় ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যেসব দেশের সঙ্গে আমরা বাণিজ্যচুক্তি করেছি, তারা সেসব প্রতিশ্রুতি বহাল রাখবে। চুক্তিতে নির্ধারিত উচ্চহার থাকলেও তা কার্যকর থাকবে।
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির প্রধান বার্ন্ড ল্যাঙ্গে এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের আচরণ পুরোপুরি ‘ট্যারিফ বিশৃঙ্খলা’। কোনো কিছুই আর স্পষ্ট নয়। ইউরোপ ও অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
রায়ের পর এশিয়ায় প্রথম বড় প্রতিক্রিয়া আসে ভারত থেকে। রয়টার্সকে ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ভারতের একটি প্রতিনিধি দলের চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে পাঠানোর কথা ছিল। এ সফর স্থগিত করা হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















